প্রফেসার ড. আসিফ মিজান

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতির ব্যাকরণ আমূল বদলে গেছে। সমকালীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে ভূ-অর্থনীতি (Geo-economics) এবং ভূ-রাজনীতি (Geo-politics) এখন আর পৃথক কোনো সত্ত্বা নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক ও দ্বান্দ্বিক চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-কৌশলগত সমীকরণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরীয় অববাহিকাটি (Bay of Bengal Basin) বর্তমানে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রধান কুরুক্ষেত্রে পরিণত হতে চলেছে। এই বহুমাত্রিক ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এবং এর সঙ্গে ভূখণ্ডগত, ঐতিহাসিক ও কৌশলগতভাবে সংযুক্ত বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর এবং চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক নতুন ভূ-কৌশলগত মেরুকরণের সূচনা করেছে। এই সম্মেলনে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’ (BMCEC) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়েছে। চীন এই ত্রিপক্ষীয় করিডোরকে তার বৈশ্বিক ভূ-কৌশলগত মহাপরিকল্পনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপ-আঞ্চলিক স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। এই করিডোরটি মূলত অতীতে প্রস্তাবিত চারদেশীয় ‘বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার’ (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোরের একটি পরিবর্তিত ও পুনর্গঠিত রূপ। ভারতের কৌশলগত অনীহা এবং চীনের 'বিআরআই' প্রকল্প থেকে দিল্লির দূরত্ব বজায় রাখার অনমনীয় নীতির কারণে 'বিসিআইএম' দীর্ঘদিন যাবৎ স্থবির হয়ে রয়েছে। এই অচলাবস্থা নিরসনে বেইজিং ভারতকে বাদ দিয়ে একটি বিকল্প ত্রিপক্ষীয় ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে, যা ২০২৬ সালের জুনে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে এক নতুন গতিবেগ লাভ করেছে।
ভূ-অর্থনৈতিক বিন্যাস এবং চীনের ‘মালাক্কা ডিলেমা’:
তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’ (BMCEC) কেবল একটি সাধারণ সংযোগ সড়ক কিংবা প্রথাগত রেল লিংক নয়; এটি মূলত একটি বহুমাত্রিক ও সমন্বিত লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক (Multi-modal Transportation Network)। এর প্রধান ভূ-অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য হলো চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডলকড (Landlocked) প্রদেশ কুনমিং থেকে শুরু করে মিয়ানমারের মান্দালয় ও রাখাইনের বুক চিরে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মোংলা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত একটি অভিন্ন অর্থনৈতিক ধমনী গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘জটিল পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তত্ত্ব’ (Complex Interdependence Theory) অনুযায়ী, আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রই এককভাবে তার জাতীয় নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক অভীষ্ট অর্জন করতে পারে না; এখানে অ-সামরিক উপাদান হিসেবে বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি নেটওয়ার্ক সার্বভৌমত্বের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পথে সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতা বা ‘অ্যাকিলিস হিল’ হলো তার জ্বালানি আমদানির রুট, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ (Malacca Dilemma) নামে পরিচিত। বর্তমানে চীনের আমদানিকৃত অপরিশোধিত খনিজ তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং মার্কিন নৌবাহিনীর আধিপত্য বিস্তারি ‘মালাক্কা প্রণালি’ হয়ে চীনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছায়। ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন বা তার মিত্রদের সঙ্গে কোনো ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত বা দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে, প্রতিপক্ষ শক্তিগুলো এই প্রণালি অবরুদ্ধ (Blockade) করে দিতে পারে। এমনটি ঘটলে চীনের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়বে।
এই ‘মালাক্কা ডিলেমা’ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী মুক্তি পাওয়ার জন্য চীনের জন্য ভারত মহাসাগরে সরাসরি এবং বিকল্প প্রবেশাধিকার (Alternative Access) প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। প্রস্তাবিত 'বিএমসিইসি' করিডোরটি চীনের ইউনান প্রদেশকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলসীমার সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এর ফলে চীন মালাক্কা প্রণালি সম্পূর্ণ এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলসীমায় প্রবেশ করতে পারবে। এটি মিয়ানমারের রাখাইনে অবস্থিত চীনের অর্থায়নে নির্মিত 'কিয়াকফিউ' গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সেখান থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত বিস্তৃত তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের সামগ্রিক উপযোগিতা ও ভূ-কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। একই সাথে, এর মাধ্যমে চীনের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, যা বেইজিংয়ের অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণ ও কানেক্টিভিটি হাবের রূপকল্প
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই করিডোরের প্রয়োজনীয়তা কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সাথে যুক্ত করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্তভাবে উত্তরণ করবে, তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশটিকে বেশ কিছু শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা হারাতে হবে। এই উত্তরণ-পরবর্তী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে এবং জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বাজারের বহুমুখীকরণ এবং সরাসরি আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপন করা অপরিহার্য।
ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ হলো দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার একটি স্বাভাবিক ‘ভৌগোলিক সেতু’ (Geographical Bridge)। করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে এই ভূখণ্ডগত অবস্থানের প্রকৃত অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। বাংলাদেশ কেবল একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং এই অঞ্চলের প্রধান ‘কানেক্টিভিটি ও লজিস্টিকস হাব’ (Connectivity and Logistics Hub) হিসেবে আবির্ভূত হবে। এই করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্য সরাসরি চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং আসিয়ান (ASEAN) ভুক্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোতে প্রবেশাধিকার পাবে। এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতের বাইরে চামড়া, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য এক বিশাল বৈশ্বিক বাজার উন্মুক্ত করবে। তদুপরি, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর এবং নবনির্মিত মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের বাণিজ্যিক উপযোগিতা এই করিডোরের মাধ্যমে বৈশ্বিক স্তরে উন্নীত হবে। চীন ও মিয়ানমারের বিশাল ট্রানজিট কার্গো হ্যান্ডলিং করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বার্ষিক বিলিয়ন ডলারের ট্রানজিট ও লজিস্টিকস রাজস্ব আয় করতে সক্ষম হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন চালিকাশক্তি যোগ করবে।
রাখাইনের জটিল বাস্তবায়ন, ব্যাকচ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান চরম অস্থিতিশীলতা এবং চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরের এই জটিল সমীকরণে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি হলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। ২০১৭ সালের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের পর থেকে প্রায় ১২ লক্ষাধিক বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপের মুখোমুখি হয়েছে, তার একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজা ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এই ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডোরকে কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক রুট বা পরিকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ না করে; বরং এটিকে দীর্ঘস্থায়ী রাখাইন সংকট সমাধানের একটি অন্যতম বড় কূটনৈতিক লিভারেজ (Diplomatic Leverage) বা দরকষাকষির কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করার যৌক্তিক অবকাশ রয়েছে।
বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক আলোচনার অন্যতম প্রধান ফোকাসই থাকে রাখাইন রাজ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা। যদিও সার্বভৌম ও প্রথাগত কূটনৈতিক প্রোটোকল অনুযায়ী, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের প্রাতিষ্ঠানিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের (জান্তা প্রশাসন) সাথেই সব ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা, চুক্তি ও দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ পরিচালনা করে আসছে। তবে রাখাইনের বর্তমান মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতাটি প্রথাগত কূটনৈতিক কাঠামোর চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের সিংহভাগ ভূখণ্ডের ওপর জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রায় বিলুপ্ত এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী 'আরাকান আর্মি' (Arakan Army) সেখানে একটি কার্যকর বেসামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই পরিবর্তিত যুদ্ধকালীন বাস্তবতায়, রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি সফল করতে হলে চীনের অনানুষ্ঠানিক ও পর্দার অন্তরালের মধ্যস্থতা (Backchannel Diplomacy) এবং রাখাইনের সব অভ্যন্তরীণ প্রধান অংশীজনদের মধ্যে একটি পরোক্ষ ও বাস্তবসম্মত বোঝাপড়া তৈরি হওয়া অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট হতে হবে। বাংলাদেশ বেইজিংকে এটি অনুধাবন করাতে হবে যে, রাখাইনে স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা এবং টেকসই মানবিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ব্যতিরেকে সেখানে চীনের বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক করিডোর কিংবা কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা কখনোই চিরস্থায়ী হবে না। যুদ্ধাবস্থা বজায় থাকলে যেকোনো পরিকাঠামোই সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। সুতরাং, চীনের নিজস্ব ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থেই রাখাইন সংকটের একটি টেকসই রাজনৈতিক (Political) মীমাংসা প্রয়োজন, যার মূল স্তম্ভ হতে হবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও নাগরিক অধিকারসংবলিত পুনর্বাসন। যদি এই অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নের মহাপরিকল্পনা বা রোডম্যাপের সাথে রাখাইনের স্থানীয় নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার, আন্তর্জাতিক মানবিক নজরদারি এবং রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের বিষয়টি শর্তযুক্ত (Conditional) ও ইতিবাচকভাবে সংযুক্ত করা যায়, তবেই কেবল এই ত্রিপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডোর একটি প্রকৃত 'উইন-উইন' (Win-Win) বা সবার জন্য সমান্তরাল লাভজনক মডেলে রূপান্তর হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। অন্যথায়, মাঠপর্যায়ের মানবিক সংকটকে উপেক্ষা করে কেবল পরিকাঠামো খাড়া করার প্রয়াস এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।
ত্রিপক্ষীয় লাভ-ক্ষতির সমীকরণ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
'বিএমসিইসি'-র মতো একটি মেগা-আঞ্চলিক পরিকাঠামো প্রকল্প কেবল সাধারণ বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একই সঙ্গে তিন দেশের জাতীয় অর্থনীতি, ভূ-কৌশল এবং সার্বভৌম নিরাপত্তার সুরক্ষাকে স্পর্শ করে। এই করিডোরটি প্রতিটি দেশের জন্য যেমন বিপুল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, তেমনি এর বিপরীতে তৈরি করতে পারে সম্ভাব্য গভীর কিছু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ঝুঁকি।
| পক্ষ | সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লাভ | সম্ভাব্য ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি |
| বাংলাদেশ | আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি হাবে রূপান্তর। ট্রানজিট ও লজিস্টিকস খাত থেকে বিপুল রাজস্ব আয়। চীনা কাঁচামাল আমদানির খরচ হ্রাস ও রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ। | চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি (Trade Deficit) আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি। দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অসম প্রতিযোগিতা। সামষ্টিক অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণের তারল্য চাপ। |
| চীন | ‘মালাক্কা ডিলেমা’ (Malacca Dilemma)'
থেকে মুক্তি ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশ। কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও পাইপলাইনের উপযোগিতা বৃদ্ধি। অনুন্নত পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ। | মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কারণে মেগা অবকাঠামোর নাশকতার ঝুঁকি। রাখাইনের অস্থিতিশীলতায় বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা। |
| মিয়ানমার | আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক দেউলিয়া অবস্থা থেকে উত্তরণ। নতুন অবকাঠামোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও বাণিজ্য পুনরুজ্জীবন। | বেইজিংয়ের ওপর অতিরিক্ত বা একক নির্ভরশীলতা (Over-dependence)। কেন্দ্রীয় জান্তা ও আরাকান আর্মির রাজস্ব হিস্যা নিয়ে অভ্যন্তরীণ সংঘাত বৃদ্ধি। |
ভূ-রাজনৈতিক গোলকধাঁধা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পরীক্ষা
এই করিডোর পরিকল্পনা কেবল তিনটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের লড়াইয়ের ক্ষেত্র। নয়াদিল্লি এই অঞ্চলে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ (String of Pearls) বা মুক্তামালা নীতি নিয়ে অত্যন্ত শঙ্কিত। ভারতের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ হলো, এই করিডোরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে চীনের একচ্ছত্র সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য তৈরি হতে পারে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (Seven Sisters) নিরাপত্তার জন্য কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করবে। ফলস্বরূপ, ভারত এই ত্রিপক্ষীয় করিডোরকে তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (IPS)-এর মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে চীনের ভূ-অর্থনৈতিক সম্প্রসারণবাদ প্রতিহত করা। ওয়াশিংটন এই অর্থনৈতিক করিডোরকে বেইজিংয়ের আঞ্চলিক দেশগুলোকে ঋণের জালে জড়ানোর একটি কৌশল বা 'ডেব্ট-ট্র্যাপ ডিপ্লোম্যাসি' হিসেবে দেখতে পারে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত জলসীমায় চীনের এই প্রবেশাধিকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এর বিপরীতে মিত্রদের নিয়ে পাল্টা অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা জোট শক্তিশালী করছে।
এই তীব্র ত্রিভুজাকার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মুখে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বেইজিং, নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের সুক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা। কোনো একটি পক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য একটি মস্ত বড় পরীক্ষা। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy) রক্ষা করা।
বাংলাদেশের করণীয়: একটি কৌশলগত রোডম্যাপ
বাংলাদেশ কীভাবে তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ অক্ষুণ্ন রেখে এবং ২০২৬-এ ব্রিকস প্লাস (BRICS+) জোটে জোরালো অংশীদারত্বের আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে উভয় সংকট সামাল দিতে পারে, তার জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়:
১. রাখাইন সংকটকে করিডোরের অপরিহার্য শর্ত করা
বাংলাদেশকে চীনকে স্পষ্ট বোঝাতে হবে যে, রাখাইনে স্থায়ী শান্তি ও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন ছাড়া বিএমসিইসি-র অর্থনৈতিক করিডোর সফল করা অসম্ভব। আর তাই, চীনের নিজস্ব বিনিয়োগের স্বার্থেই তাকে রাখাইনের স্থিতিশীলতায় কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে হবে।
২. ঋণ-ফাঁদ (Debt-trap) এড়িয়ে চলা
চীনের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। ঋণের শর্তাবলী, সুদের হার, গ্রেস পিরিয়ড এবং পরিশোধের সময়সীমা কঠোরভাবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর আলোকে যাচাই করতে হবে যাতে কোনোভাবেই ঋণ-ফাঁদের ঝুঁকি তৈরি না হয়।
৩. বহুমাত্রিক ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি (Multi-alignment):
এই করিডোরে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে, যাতে কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্লকের ওপর ঢাকার একক ভূ-রাজনৈতিক নির্ভরতা তৈরি না হয়।
রাখাইনের স্থিতিশীলতার সঙ্গে এই অর্থনৈতিক করিডোরের সাফল্য গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশ যদি অত্যন্ত দূরদর্শী, বাস্তবসম্মত এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি প্রদর্শন করতে পারে, তবে ভূ-রাজনীতির এই নতুন সমীকরণকে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন সোপান হিসেবে রূপান্তর করা সম্ভব হবে, যা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান বাস্তবায়নে এক অনন্য কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।