
মে মাসের প্রথম দিনটি বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে পালিত হয়—মহান মে দিবস। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। রক্তঝরা সেই আন্দোলনের স্মৃতিকে ধারণ করেই আজকের এই দিনটি শ্রমিক অধিকার ও ন্যায্যতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মে দিবসের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো শ্রমিক শ্রেণি—গার্মেন্টস, শিল্প কারখানা, নির্মাণ খাত, কৃষি—সবখানেই তাদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত খাত হলো লিফট বা এলিভেটর সেক্টর, যেখানে হাজারো দক্ষ শ্রমিক, টেকনিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়ার প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন দেশের নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য।
আজকের বাংলাদেশে বহুতল ভবন, শিল্প কারখানা, হাসপাতাল, শপিং মল—সবখানেই এলিভেটর অপরিহার্য। এই খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলী, ইনস্টলেশন টিম, রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী এবং ফিল্ড টেকনিশিয়ানরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশে কাজ করেন। একটি লিফটের সঠিক স্থাপন ও নিরাপদ পরিচালনা নিশ্চিত করতে তাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও শ্রমের কোনো বিকল্প নেই।
তবে বাস্তবতা হলো, এই খাতের অনেক শ্রমিক ও কারিগরি কর্মী এখনও পর্যাপ্ত স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। উচ্চতা ঝুঁকি, বৈদ্যুতিক ঝুঁকি এবং যান্ত্রিক জটিলতার মধ্যেও তারা কাজ করেন—কিন্তু তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সেফটি স্ট্যান্ডার্ড, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা সবসময় নিশ্চিত হয় না।
মে দিবসের চেতনা শুধু সাধারণ শ্রমিক নয়, বরং এই প্রযুক্তিনির্ভর খাতের কর্মীদের প্রতিও সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ একটি আধুনিক শহর গড়ে তুলতে যেমন স্থপতি ও প্রকৌশলীর প্রয়োজন, তেমনি লিফট সেক্টরের শ্রমিকদের অবদানও অপরিসীম।
বাংলাদেশ এলিভেটর, এস্কেলেটর অ্যান্ড লিফট ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেলিয়া)-এর মতো সংগঠনগুলোর মাধ্যমে এই খাতকে আরও সংগঠিত, নিরাপদ ও মানসম্মত করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
তবে আরও প্রয়োজন—
দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন
আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ
নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ
শ্রমিক ও ইঞ্জিনিয়ারদের ন্যায্য পারিশ্রমিক
মে দিবস আমাদের শুধু অতীতের সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয় না, বরং বর্তমান বাস্তবতার প্রতিও প্রশ্ন তোলে—আমরা কি সত্যিই সকল খাতের শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছি?
এই দিনে প্রয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তব উদ্যোগ। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে একসাথে কাজ করতে হবে।
মহান মে দিবস আমাদের শেখায়—অধিকার কেউ দেয় না, তা অর্জন করতে হয়। তাই এই দিনটি হোক সকল শ্রমিক—বিশেষ করে অবহেলিত প্রযুক্তিনির্ভর খাতের কর্মীদের জন্য—ন্যায্যতা, নিরাপত্তা ও সম্মানের নতুন অঙ্গীকারের দিন।
লেখক: সদস্য, বেলিয়া; ম্যানেজিং ডিরেক্টর, সিগমা লিফট কোম্পানি লিমিটেড; সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক বাংলাদেশের কণ্ঠ