
বাবা-মায়ের কবরের পাশে তারেক রহমান;শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এক আবেগঘন মুহূর্ত
রাজনীতিতে সাফল্য আসে, সিদ্ধান্ত আসে, ইতিহাসের বাঁকবদল আসে। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের পরও ফিরে যাওয়ার জায়গা থাকে বাবা-মায়ের কবরের পাশে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথচলার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এমন একটি বিষয় বারবার চোখে পড়ে।
নির্বাচনী প্রচারণার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করার আগে তিনি বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেছেন। আবার দীর্ঘ নির্বাচনী কর্মসূচির পরও প্রথমে গেছেন তাঁদের কবরের পাশে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও দিনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম শুরু করেছেন বাবা-মায়ের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে। আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরও সংসদ থেকে সরাসরি বাসায় না ফিরে ছুটে গেছেন সেই চিরচেনা ঠিকানায়।
এটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয় আমার কাছে এটি তারেক রহমানের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দর্শনের একটি গভীর প্রতীক।
কারণ রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোতে মানুষ অনেককে পাশে পায়, আবার অনেককে হারিয়েও ফেলে। ক্ষমতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ; কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে অটল থাকা অনেক কঠিন। বিশেষ করে যখন সিদ্ধান্তের চারপাশে থাকে নানা হিসাব, নানা মত, নানা চাপ এবং নানা স্বার্থ।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটিও যে খুব সহজ ছিল না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাষ্ট্রপতি পদকে ঘিরে নানা ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ ও আলোচনা ছিল। এই পরিস্থিতিতে একজন রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত, দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধাকে বেছে নেওয়া ছিল একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।
বিএনপির অতীত অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে কাউকে বসানোর সিদ্ধান্ত সবসময় প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার রাজনৈতিক বিশ্বস্ততাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়।
আর সেই আস্থার জায়গায় যার নাম এসেছে, তিনি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ফখরুল শুধু একজন দলীয় নেতা নন; দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি জিয়া পরিবারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কঠিন সময়ের বিএনপিকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সংকটময় সময়ে দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন সামনের সারির অন্যতম ব্যক্তি।
বেগম খালেদা জিয়া যদি আজ শারীরিকভাবে সুস্থ থেকে এই দৃশ্য দেখতে পারতেন, তাহলে হয়তো তাঁর জন্য এটি বিশেষ এক আবেগের মুহূর্ত হতো।তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোদ্ধাকে তাঁরই ছেলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রাজনীতিতে পদ-পদবি অনেকেই পান। কিন্তু আস্থা অর্জন করেন খুব কম মানুষ। আর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো সেই আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
মির্জা ফখরুলের বিদায়ী বক্তব্যের আবেগঘন মুহূর্তটিও তাই আলাদা তাৎপর্য বহন করে। কান্নাভেজা কণ্ঠে তারেক রহমানের উদ্দেশে তাঁর যে অঙ্গীকার :- দায়িত্ব অর্পণ করা হলে জীবন দিয়ে হলেও তা বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন করবেন- তা শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, আস্থা ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন।
আর সবশেষে তারেক রহমানের কবর জিয়ারতে ফিরে যাওয়া যেন পুরো ঘটনাটিকে অন্য এক মাত্রা দেয়।
ক্ষমতার শীর্ষে উঠেও তিনি ফিরে যান শেকড়ের কাছে। বড় সিদ্ধান্তের পর ফিরে যান বাবা-মায়ের কাছে। রাজনৈতিক বিজয়ের পরও ফিরে যান তাঁদের নীরব সমাধির পাশে।
হয়তো সেখানে কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা নেই, কোনো ক্যামেরার প্রয়োজন নেই, নেই ক্ষমতার হিসাব। আছে শুধু স্মৃতি, শ্রদ্ধা আর শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা।
রাজনীতির ইতিহাসে কে কত বড় পদ পেলেন, সেটি সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। কিন্তু একজন মানুষ তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জনের মুহূর্তে কোথায় ফিরে যান সেটি তাঁর চরিত্র সম্পর্কে অনেক কিছু বলে।তারেক রহমানের ক্ষেত্রে সেই ঠিকানাটি বারবার ওই বাবা-মায়ের কবরের পাশে।
আর সেই কারণেই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর ভিড়ে এই দৃশ্যটি আমার কাছে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়।
লেখক: বি এম মারফুল আলম রোমান