
সংগৃহীত ছবি
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধাহত নারী মুক্তিযোদ্ধা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান শেষে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে সাদুল্লাপুরের উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হক রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করেন। এ সময় সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) হাসান কবীরসহ প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুসারে নিজ বাড়ির উঠানে পূর্বসূরিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ফুলমতি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি। প্রায় দুই বছর আগে ব্রেন স্ট্রোকে তার ডান হাত ও পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী ছিলেন। মৃত্যুকালে চার ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন এই বীরাঙ্গনা।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের আগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছেন বা অবদান রেখেছেন, তারা এ দেশের সূর্যসন্তান। তাদের আত্মত্যাগ অবিস্মরণীয়।’ তিনি জানান, যুদ্ধাহত ফুলমতিকে পরবর্তী সময়ে বীরাঙ্গনার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুম সম্পাদিত ‘হৃদয়ে একাত্তর’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফুলমতি রানি নামে পরিচিত এই বীরাঙ্গনার জন্ম সাদুল্লাপুর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা তাকে ধরে নিয়ে নির্যাতন চালায়। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তার স্বামীর বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে তার সামনেই ফুলমতির ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল।
স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর ২০১৬ সালের মার্চে বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান ফুলমতি। ২০১৭ সালে তার জন্য নির্মাণ করা হয় চার কক্ষবিশিষ্ট ‘বীর নিবাস’। স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া ১৯৮৮ সালে মারা যাওয়ার পর পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সংগ্রামী জীবন কাটান তিনি। অভাব-অনটনের মধ্যেও শেষ দিন পর্যন্ত কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি এই আত্মমর্যাদাশীল নারী।
সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির ত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান। শয্যাশায়ী অবস্থায় তার চিকিৎসায় সরকারি পর্যায় থেকে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে ফুলমতি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন এই সংগ্রামী নারী।
ফুলমতির ছেলে মনিরাজ কুমার রবিদাস জানান, তার মা দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে ব্রেন স্ট্রোকের পর তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর নিজ ঘরেই তার মৃত্যু হয়। পরে বাড়ির উঠানে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। মায়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
ফুলমতির মৃত্যুতে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়দের মতে, ফুলমতি শুধু একজন নারী নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার নির্যাতন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সমাধিস্থলে স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোছা. মাহাবুবা বেগম বলেন, বীরাঙ্গনা ফুলমতির আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তার স্মৃতি ধরে রাখতে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা জরুরি।
লাল-সবুজের পতাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হয়েছে বীরাঙ্গনা ফুলমতিকে। তার নির্যাতন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বেদনাবিধুর এক গৌরবময় অধ্যায় হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।