রবিবার ৩০ আগস্ট ২০২৬ ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩

শিরোনাম: শরণখোলায় মাদ্রাসার ছাত্রকে গুরুতর মারধরের অভিযোগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে   চোখে আলো নেই, ৪০ বছর ধরে মায়ের সংসারের শেষ ভরসা মুকলেস!   জিনিয়াস শেফ আয়োজন করলো বেকিং কর্মশালা   বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ নিয়ে নতুন সম্ভাবনা   হঠাৎ হাসপাতালে ভর্তি ঊর্ফী জাভেদ   মার্কিন অর্থনৈতিক অভিযান থেকে বাঁচার যে উপায় জানালেন মোজতবা!   নিজ কাণ্ডে দুঃখ প্রকাশ করলেন হাসনাত আবদুল্লাহ!   
চাঁপাইনবাবগঞ্জে নদীতে ডুবে যাওয়া পাঁচ শিশুর রাতে দাফন সম্পন্ন
মোঃ সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৮ পিএম   (ভিজিট : ৭৬)

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গ্রামে এখন শুধুই কান্নার রোল। থেমে থেমে বাতাসে ভেসে আসছে স্বজনদের আহাজারি, ভারী হয়ে আছে পুরো গ্রামের বাতাস। স্বজনদের কারোও চোখে পানি, কারও মুখে কথা নেই, প্রিয় পাঁচ শিশুর আকস্মিক মৃত্যু যেন মুহূর্তেই নিভিয়ে দিয়েছে পাঁচটি পরিবারের আলো। সরজমিনে এসব দৃশ্যের অবতারনা হয়। মা,বাবা ভাই বোন  নিকটতম আত্মীয় স্বজনদের কাঁদিয়ে স্থানীয় পারিবারিক গোরস্থানে তাদের দাফন করা হয়।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য, বিদেশে থাকা বাবাদের মোবাইল ফোনে শেষবারের মতো দেখানো হচ্ছে তাদের আদরের সন্তানদের নিথর মুখ। সন্তান হারানোর শোকে বাবাদের কান্না আর মায়েদের বুকফাটা আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। মোবাইলের ওপাশে থাকা বাবারা অশ্রুসিক্ত চোখে শেষবারের মতো দেখছেন তাদের প্রাণের সন্তানকে। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনরাও কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

গতকাল শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুর পৌনে ১টার দিকে জুমার নামাজের সময় মরা পাগলা নদীতে গোসল করতে নেমে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারায় পাঁচ কন্যাশিশু। তাদের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে চর চাকলা গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আনন্দ-চঞ্চলতায় মুখর যে শিশুদের নিয়ে পরিবারগুলোর স্বপ্ন ছিল, সেই শিশুরাই এখন সবার চোখের জলে চিরবিদায় নিয়েছে।

নিহত শিশুরা হলো, চর চাকলা গ্রামের মাসুদ রানার দুই মেয়ে সুমাইয়া (১০) ও আরিবা (৮), নিজামুদ্দিনের দুই মেয়ে সুমাইয়া (১২) ও সুরাইয়া (৯) এবং শরিফুল ইসলামের মেয়ে শরীফা (১২)।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী , শুক্রবার জুমার নামাজের সময় গ্রামের অধিকাংশ মানুষ মসজিদে ছিলেন। এ সুযোগে শিশুরা পরিবারের কাউকে না জানিয়ে মরা পাগলা নদীতে গোসল করতে নামে। কিছুক্ষণ পর তাদের আর দেখা না গেলে খোঁজ শুরু হয়। পরে নদীতে গিয়ে তারা পানিতে ডুবে গেছে বলে জানা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন  প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এ এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তবে একই গ্রামের তিন পরিবারের পাঁচ শিশুর একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।

প্রতক্ষ্যদর্শী আকলিমা  খাতুন কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, শিশুরা নদীতে গোসল করার সময় হঠাৎ তাদের আর দেখা যাচ্ছিল না। তখন তিনি চেচামেচি শুরু করলে স্থানীয়রা দ্রুত নদীতে নেমে তাদের উদ্ধার  করেন,  তবে ততক্ষণে পাঁচ শিশুই মারা যায়।

সদর উপজেলার দেবিনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান জানান, চর চাকলা গ্রামের পাশের নদীটি স্থানীয়ভাবে ‘মরা পদ্মা নদী’ নামে পরিচিত। এটি পদ্মা নদীর একটি শাখা। বর্ষা ও বৃষ্টির সময় পদ্মার পানি ঢুকে নদীটি ভর্তি  হয় পড়ে।  বছরের অন্য সময় নদীতে তেমন পানি থাকে না।

সম্প্রতি কয়েক দিনের বৃষ্টি ও পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মরা পাগলা নদীতে পানি বেড়ে যায়। শুক্রবার দুপুরে শিশুরা মা বাবার অজান্তে  পানিতে গোসল করতে নামে এবং এ দুর্ঘটনা ঘটে।

দেবিনগর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, কয়েকজন শিশু নদীতে গোসল করতে নেমেছিল। একপর্যায়ে তারা একে একে পানিতে ডুবে যায়। পরে স্থানীয়রা নদীতে তল্লাশি চালিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করেন। এ ধরনের দুর্ঘটনা এই গ্রামে  প্রথম বলে উল্লেখ করে তিনি পাঁচ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।

দেবিনগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় সমাজ সেবক  আব্দুর রহমান বিশ্বাস  বলেন, পাঁচ শিশুকে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে চর চাকলা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়। একই সঙ্গে পাশাপাশি পাঁচটি শিশুকে দাফন করা হয়েছে। একসঙ্গে এতগুলো কবর আগে কখনো খোঁড়া হয়নি। তিনি শিশুদের জন্য দোয়া করেন।
কলেজ শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান বলেন, প্রতিবছরই এলাকায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কেউ পানিতে ডুবে গেলে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলেও উদ্ধারকর্মীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। এলাকায় ডুবে যাওয়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে প্রশিক্ষিত কোনো উদ্ধারকর্মী নেই। এমনকি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।

একই এলাকার বাসিন্দা শুকুরদ্দি বিশ্বাস  বলেন, তাদের গ্রামে যেতে একটি নদী পার হতে হয়। গ্রাম পর্যন্ত পাকা রাস্তাও নেই। প্রতি বছর শিশুরা পানিতে ডুবে মারা গেলেও এ বিষয়ে কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগও পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরিবারের সদস্যরা শিশুদের চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করেন। তবে শিশুরা চোখের আড়াল হলেই দুর্ঘটনা ঘটায়  বলে জানান তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজও পাঁচ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বন্যার পানিতে গোসল করতে নেমে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ রাত  আট টার সময় তাদের পাশাপাশি দাফন করা হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন জানান, তিনি নিহত শিশুদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যু কমাতে বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। মসজিদ ও বিদ্যালয়কেন্দ্রিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু এবং বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কার্যক্রমও চলছে।

তবে দুর্গম এলাকায় স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী বা শিশুদের সাঁতার শেখানোর কার্যক্রম বর্তমানে চালু নেই বলে জানান ইউএনও। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

এই ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল শোকবার্তায় শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে এ অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দেওয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।

অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশিদও শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জুমার সময় পুরো গ্রামে নেমে এসেছে নীরব হাহাকার। নদীর পানিতে গোসল করতে নেমে পাঁচ শিশুর প্রাণহানি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তিনি নিহত শিশুদের জন্য জান্নাতুল ফেরদৌস কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত স্বজনদের এই কঠিন শোক সহ্য করার শক্তি দেওয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মোঃ মুশা বলেন বিষয়টি ভীষণ দুঃখ  জনক। সন্তান হারা  ঐসব পরিবারের শোক সইবার ক্ষমতা দেয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রাথনা করছি। এসব পরিবারকে সহায়তা করার জন্য  সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ রেখেছি। তিনি আরও বলেন এখনকার অভিভাবকগন কে অনুরোধ করবো আপনাদের সন্তানদের লেখাপড়া ঠিক রেখে  খেলাধুলা সাঁতারসহ সকল ক্ষেত্রে সাবলম্বী করার অনুরোধ করছি। পাশাপাশি স্থানীয় সমাজসেবক শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিদের  শিশুদের সমৃধ্যকরন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করতে উত্সাহিত করার আহবান জানান তিনি।









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]