শনিবার ● ৭ নভেম্বর ২০২৬ ● ২২ কার্তিক ১৪৩৩

শিরোনাম: আত্রাইয়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত   ৭ নভেম্বর না হলে দেশ ভারতীয় আগ্রাসন থেকে মুক্ত হতনা: নাসের রহমান   শরণখোলায় বিপ্লব ও‌ সংহতি দিবস পালিত    আজানের প্রতি সম্মান জানিয়ে ছয় মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেন প্রধানমন্ত্রী   কবিতা চত্বরে ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযানে বৃদ্ধার দোকান ও নামাজঘর উচ্ছেদ   গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা ও অবসরকালীন সুবিধা বাড়ালেন প্রধানমন্ত্রী   সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ ৭ বাংলাদেশি নিহত   
কবিতা চত্বরে ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযানে বৃদ্ধার দোকান ও নামাজঘর উচ্ছেদ
মোহাম্মদ শফিক, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ৬:০৩ পিএম   (ভিজিট : ৬২)

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যে ছোট্ট দোকানটি ছিল তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন, সেই দোকানটিও কেড়ে নেওয়া হলো রাতের অভিযানে। শবে- মেহরাজ বয়স প্রায় ৬৫ বছর। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কবিতা চত্বরে ছোট্ট একটি টং দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন বৃদ্ধা। কিন্তু বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাত ৯টার দিকে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর সেই শেষ সম্বল। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ (যা প্রতিবেদক এর কাছে অভিযোগ এর ভিডিও সংরক্ষণ আছে) শুধু দোকান নয়, ভেঙে ফেলা হয়েছে তাঁদের সৈকতের ব্যবহৃত কিটকট চেয়ার এবং পর্যটক ও স্থানীয় দর্শনার্থীদের নামাজ আদায়ের জন্য তৈরি একটি উন্মুক্ত নামাজের ঘরও। ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কবিতা চত্বরে। 

ভুক্তভোগী পরিবার জানান, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুর রহমান সায়েমের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে পৌরসভার বুলডোজার দিয়ে প্রায় সর্বমোট ৩৬ পর্যটকদের বসার কিটকট চেয়ার গুঁড়িয়ে দিয়ে একেবারে কাট করে ফেলা হয়। একই সঙ্গে বৃদ্ধার টং দোকানটি ভেঙে ফেলা হয়। দোকানে থাকা প্রায় ৭ হাজার টাকার মাম পানির বোতলসহ অন্যান্য মালামালও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে পৌরসভার গাড়ি যোগে এগুলো নিয়ে যাওয়া হয়।

ভুক্তভোগী শবে-মেহরাজ ও তাঁর ছেলে রফিক জানান, "দীর্ঘ ৩০-৪০ বছর ধরে ওই এলাকায় ছোট্ট দোকান পরিচালনা করে আসছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই নারী নিজের সামান্য আয় দিয়েই সংসার চালাতেন। বড় কোনো ব্যবসা কিংবা বিলাসী জীবনের স্বপ্ন নয়, ছোট্ট দোকানটিই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন। সেই দোকান হারিয়ে এখন তিনি চরম অসহায় অবস্থায় পড়েছেন"।

শবে মেহরাজ ছেলে মোহাম্মদ ইলিয়াস ফোনে অভিযোগ করে বলেন, ওই দিন রাত প্রায় ৯ টা। হঠাৎ অভিযানে আসে বিচ ম্যাজিস্ট্রেট। কোন কথা নেই,প্রথমে সৈকতের এক পাশে তৈরী করা উন্মুক্ত নামাজের ঘরটি ভেঙে দেয়। এর পর বিচ কর্মীদের ইশারায় এক এক করে সব তার ভাই রফিক ও তার প্রায় ৩৬ টি কিটকট চেয়ার গুড়িয়ে দেয়। এছাড়া "অভিযানের সময় তাঁর ভাই রফিক ও মা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। রাতে দোকান ঘর ও অন্যান্য মালামাল গুছিয়ে বাড়ি চলে যায়। ফলে জেলা প্রশাসনের অনুমতিপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখানোর সুযোগ পাননি। 

তাঁদের দাবি, দোকানটি সরকারি জায়গা দখলের উদ্দেশ্যে করা হয়নি। সৈকতে আসা পর্যটক ও স্থানীয় দর্শনার্থীদের নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে বালিয়াড়ির এক পাশে একটি উন্মুক্ত নামাজের ঘরও তৈরি করা হয়েছিল। সেটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ট্যং এর দোকানটির প্রায় ৭ হাজার পানির বোতল নিয়ে যায়। এতে উচ্ছেদ এর নামে তাঁরা মানবিক বির্পযয়ে পড়ে যায়। আর রাত ৯টার পরে কেন অভিযান? এটা এক প্রকার বর্বরতা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কোন পক্ষের মিশন বাস্তবায়ন"

স্হানীয়দের প্রশ্ন, কোনো স্থাপনা অবৈধ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার প্রশাসনের অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু একজন বয়োবৃদ্ধ নারীর জীবিকার একমাত্র অবলম্বনটি ভেঙে দেওয়ার আগে তাঁকে সতর্ক করা কিংবা নিজের কাগজপত্র দেখানোর সুযোগ দেওয়া কি সম্ভব ছিল না? রাতের আঁধারে অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে দিনের আলোয় মানবিকভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা যেত না? এটা এক প্রকার ক্ষমতার অপব্যবহার। 

এছাড়া ২/১টি চেয়ার ভেঙে অর্থাৎ অর্থ দন্ড দিতে পারতো কিন্তু সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবেই প্রায় ৩৬ টি চেয়ার বল্ডুজার দিয়ে গুড়িয়ে দিয়ে তাদের নিঃশ্ব করে দিয়েছে।অভিযানের পর বৃদ্ধা রোকেয়ার অসহায়ত্ব ও কান্না স্থানীয়দেরও ব্যথিত করেছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের জীবন-জীবিকা ও মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়াও প্রশাসনের দায়িত্ব।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুর রহমান সায়েমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, "সংশ্লিষ্টদের অনুমতিপত্র বা কার্ড না থাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় প্রায় ৩২টি কিটকট চেয়ার, একটি টং দোকান ও একটি নামাজের ঘর অপসারণ করা হয়। দোকানের কিছু মাম পানির বোতলসহ অন্যান্য মালামালও নিয়ে আসা হয়েছে। এ ছাড়া ইলিয়াসকে ১ হাজার ৫০০ টাকা ইলিয়াসকে জরিমানা করা হয়েছে"।

দোকানের মালামাল ও পানির বোতল কোথায় নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান, পানির বোতলগুলো একটি এতিমখানায় দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সময় তিনি 
ঠাট্টা করে আরও মন্তব্য করেন, "এর জন্য বুড়ি সওয়াব পাবে"।

এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বহুবার অসৌজন্যমূলক আচরণ নিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সায়েম। তার পেশাদারিত্ব, যোগ্যতা নিয়ে চরম প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে,চলছ আলোচনা সমালোচনা-ও। 

তবে এই ঘটনার মূল প্রশ্ন এখন একটাই—অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়ে একজন বৃদ্ধার জীবনের শেষ অবলম্বনটুকুও কি এভাবে কেড়ে নিতে হবে? প্রশাসনের অভিযান আইনসম্মত হওয়ার পাশাপাশি মানবিক হওয়াও কি জরুরি নয়?

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা সবার। কিন্তু সেই পর্যটন ব্যবস্থাপনায় অসহায় মানুষ, স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ মানুষের মানবিক অধিকারও যেন উপেক্ষিত না হয়।

ভুক্তভোগী পরিবার জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযানে নেওয়া মালামালের হিসাব, ক্ষতিগ্রস্ত বৃদ্ধার বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় দেখা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার। না হয় তাঁরা আদালত এর আশ্রয় নিবে বলেও জানান।

কক্সবাজারের সুযোগ্য ও মানবিক জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নান জানান, “অভিযানের বিষয়ে আমি তাঁকে ডেকে ঘটনার বিস্তারিত খোঁজ খবর নিচ্ছি।”









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]