
সংগৃহীত ছবি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আশুলিয়ায় বিক্ষোভকারীদের মরদেহ পোড়ানোর ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছিল বলে উল্লেখ করা একটি পুলিশ পিকআপ ভ্যান প্রায় দুই বছর পর উদ্ধার করা হয়েছে। ভ্যানটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মারক হিসেবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর।
জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ জানিয়েছেন, ভ্যানটি জাদুঘরের হেফাজতে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি প্রতীক এবং হাসিনা সরকারের সময়কার ভয়াবহতার স্মারক। আমরা এটি সংরক্ষণ করে জুলাই জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি।”
এহসান মাহমুদ জানান, ভ্যানটি জাদুঘরে হস্তান্তরের জন্য সরকারি প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন লাগবে। এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সাভারের আশুলিয়ার বাইপাইলে জমি উদ্ধারের একটি অভিযানের সময় ভ্যানটির সন্ধান পাওয়া যায়। বিভিন্ন মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা সামগ্রীর সঙ্গে এটি একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে পুলিশের অস্থায়ী ডাম্পিং এলাকায় রাখা ছিল। ভ্যানটির খবর ছড়িয়ে পড়লে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে জড়ো হন। তারা ভ্যানটি নষ্ট বা ফেলে না দিয়ে সংরক্ষণের দাবি জানান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আলোচিত ঘটনাটি ঘটে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে আশুলিয়া থানার কাছে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, পরে নিহতদের মরদেহ একটি গাড়িতে তুলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ছয়জন নিহত হন। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগুন দেওয়ার সময় একজন ভুক্তভোগী জীবিত ছিলেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয়ের তদন্তেও ঘটনাটি উঠে আসে। ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংস্থাটি আশুলিয়া থানার কাছে একটি গাড়িতে মরদেহ তোলা এবং পরে সেগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যের কথা উল্লেখ করে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হত্যা ও মরদেহ পোড়ানোর ঘটনায় কয়েকজনকে দোষী সাব্যস্ত করেন।
এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত ভ্যানটি দীর্ঘদিন একটি ডাম্পিং এলাকায় পড়ে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কর্মীরা। জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের (জেআরএ) সদস্যরা জানান, বৃহস্পতিবার ভ্যানটি সরিয়ে নেওয়ার খবর পেয়ে তাঁরা সেখানে যান।
সংগঠনটির সভাপতি সালেহ মাহমুদ রায়হান বলেন, ভ্যানটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত হলেও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় ইতোমধ্যে রায় দিয়েছেন। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আলামত দুই বছর ধরে এভাবে পড়ে ছিল।”
জেআরএর দাবি, তাদের সদস্যরা ভ্যানটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেন। এ সময় ভ্যানটির কাছ থেকে পোড়া হাড়, একটি চাবির রিংসহ আরও কিছু সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলো সম্ভাব্য আলামত হতে পারে। সংগঠনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছে, ভ্যানটি ভেঙে ফেলা বা অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তারা দ্রুত ভ্যানটি জুলাই জাদুঘরে সংরক্ষণের দাবি জানায়।
তবে ভ্যানটি ধ্বংস করার উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তারিকুল ইসলাম জানান, থানায় মামলার আলামত রাখার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ভ্যানটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “থানায় নিজস্ব জায়গা না থাকায় এটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে রাখা হয়েছিল। জমির মালিক জায়গাটি ফেরত নেওয়ায় আলামতগুলো আমাদের নিজস্ব স্থাপনা, কবিরপুরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।”
পুলিশের ভাষ্য, ভ্যানটি ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং জমির মালিক জায়গাটি ফেরত চাওয়ায় অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এখন প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভ্যানটি জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।