# নির্জন এলাকায় ঝটিকা মিছিল করছে # তৃণমূলের নেতাদের পরিবারগুলো সংকটে # কতিপয় বিএনপি নেতার আনুকূল্য পাচ্ছে

জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর থেকে টাঙ্গাইলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও আত্মগোপনে ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন নিজেদের গুটিয়ে রাখার পর সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় তাদের কিছুটা ‘মাথচাড়া’ দিয়ে ওঠার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, আগামী ডিসেম্বরে দলটির শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন ও ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ভেতরে-ভেতরে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। সরাসরি দলীয় ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে না পারলেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ক্রীড়া সংগঠন এবং পাড়া-মহল্লার সাংস্কৃতিক ফোরামগুলোকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মীরা একজোট হচ্ছেন। বিভিন্ন সামাজিক উৎসব, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, অরাজনৈতিক আলোচনা সভা, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আড়ালে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করছেন। সাধারণ মানুষের সাথে জনসংযোগ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে তারা নানামুখী সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন এবং এর মাধ্যমে ভেতরে-ভেতরে দলের পক্ষে এক ধরণের নীরব সমর্থন ও সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে টাঙ্গাইল শহরের বিভিন্ন সড়ক এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু নির্জন এলাকায় হঠাৎ হঠাৎ দলটির নেতাকর্মীরা আকস্মিক ‘ঝটিকা মিছিল’ বের করছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও স্থানীয়দের ধাওয়া খেয়ে মুহূর্তের মধ্যেই ওই মিছিলগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের এই গোপন তৎপরতা ও ঝটিকা মিছিলের প্রতিবাদে রাজপথে পাল্টা শক্ত অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গ সংগঠনগুলো। দলটির সম্ভাব্য যেকোনো ‘নৈরাজ্য’ ঠেকাতে নিয়মিত বিক্ষোভ মিছিল ও সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছেন বিএনপি ও ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীরা।
সামাজিক কর্মকাণ্ড ও ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে তৃণমূলের কিছু কর্মী মাঠে দেখা দিলেও দলটির শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ এখনও পুরোপুরি আত্মগোপনে রয়েছেন। দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকার কারণে আত্মগোপনে থাকা এসব মাঝারি ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের পরিবারগুলো এখন তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা ঘরে না থাকায় অনেকের পরিবারে ভরণ-পোষণ ও দৈনন্দিন খরচ চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে- এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পরিবারগুলো বিভিন্ন সামাজিক বিবাদ ও পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় কোনো আওয়ামী অভিভাবক না পেয়ে নিরুপায় হয়ে বিএনপি নেতাদের দ্বারস্থ হচ্ছেন। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক সালিশ কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রায়শই এলাকার প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের শরণাপন্ন হচ্ছেন এবং বিএনপি নেতারাও মানবিক কারণে বা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এসব সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
টাঙ্গাইলের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর নিষিদ্ধ সংগঠনের এমন কৌশলগত সামাজিক তৎপরতা ও ঝটিকা মিছিল জেলাটিতে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় পুলিশ ও প্রশাসন সম্পূর্ণ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আত্মগোপণে থাকা কয়েকজন আওয়ামীলীগ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মামলা-হামলা চালিয়ে তাদেরকে বিপর্যস্ত করে ফেলা হয়েছে। রাজনৈতিক ইস্যূতে দায়েরকৃত মামলার জামিনও দেওয়া হচ্ছেনা। তবে তাদের নেত্রী যেকোনো মূল্যে ডিসেম্বরে দেশে ফিরছেন। সেজন্য তারা সতর্কতার সঙ্গে ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও সাংগঠনিক তৎপরতা চালাচ্ছেন- প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। তাই তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করার চেষ্টা করছেন।
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি হাসানুজ্জামিল শাহীন জানান, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের মিটিং-মিছিল করার অধিকার নেই। জেলা বিএনপি এ বিষয়ে সোচ্চার রয়েছে। তাদের যেকোন ধরনের নৈরাজ্য রুখতে জেলা বিএনপি রাজপথে রয়েছে, দলের পক্ষ থেকে প্রায়ই বিক্ষোভ-সমাবেশ সহ সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর মতো যেকোনো অপচেষ্টা নস্যাৎ করতে পুলিশ সম্পূর্ণ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জেলার কোথাও নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের প্রকাশ্যে বা গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর কোনো আইনি সুযোগ নেই। সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে যদি কেউ উসকানিমূলক তৎপরতা কিংবা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করে- তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ জেলার প্রতিটি এলাকায় নজরদারি জোরদার করেছে এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন বদ্ধপরিকর।