
সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর কোথাও খালে, কোথাও ঝিলে; কখনো ফুটপাতে, হাসপাতালের পাশে কিংবা পরিত্যক্ত ভবনে মিলছে মরদেহ। কারও শরীরে থাকছে আঘাতের চিহ্ন, আবার দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় অনেক মরদেহে পচন ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পরিচয় শনাক্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রাজধানীতে ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের সৎকার করা হয়েছে। একের পর এক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর শ্যামপুর থানার জুরাইন রেলওয়ে সেতুর নিচে একটি পরিত্যক্ত পাবলিক টয়লেট থেকে আনুমানিক ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার মাথায় পচন ধরে হাড় বেরিয়ে এসেছিল এবং কপালেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। পুলিশ ধারণা করছে, উদ্ধারের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। শ্যামপুর থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান, মরদেহে পচন ধরে যাওয়ায় সিআইডি ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করতে পারেনি। পরিচয় শনাক্তে এলাকায় প্রচারণা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত কেউ কিশোরটির বিষয়ে তথ্য দিতে পারেনি।
জুরাইনের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি বছর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। তবে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, শুধু শাহবাগ থানা এলাকাতেই চলতি বছরে অন্তত ১১টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
তবে অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ মরদেহের হিসাব এক নয়। উদ্ধারের সময় পরিচয় জানা না থাকলে মরদেহটি অজ্ঞাত হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পরে পুলিশ পরিচয় শনাক্ত ও স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে সেটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়।
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে রাজধানীতে ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহের সৎকার করা হয়েছে। এর মধ্যে রায়েরবাজার কবরস্থানে ৩২৬টি এবং জুরাইন কবরস্থানে ৭৪টি মরদেহ দাফন করা হয়। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯টি, মার্চে ৫২টি, এপ্রিলে ৪৬টি, মে মাসে ৫৬টি, জুনে ৬৭টি, জুলাইয়ে ৪২টি এবং আগস্টে ৪৮টি মরদেহের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০টি বেওয়ারিশ মরদেহের সৎকার করেছে সংস্থাটি।
তবে এই সংখ্যা রাজধানীতে অজ্ঞাত মরদেহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সরাসরি প্রমাণ নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এতসংখ্যক বেওয়ারিশ মরদেহের বিষয়ে তার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. আক্তার হোসেনও বলেন, বেওয়ারিশ মরদেহ বেড়েছে—এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই; বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুলিশের অনুমোদন ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না।
অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্তেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। মরদেহ নতুন অবস্থায় উদ্ধার হলে আঙুলের ছাপ, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, মোবাইল ফোন, পোশাকসহ বিভিন্ন আলামত থেকে পরিচয় শনাক্তের সুযোগ থাকে। কিন্তু কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর পচন ধরলে ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তখন ডিএনএ পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য ও স্বজনদের দেওয়া বর্ণনার ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব সূত্রও পাওয়া যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পরিচয়হীন মরদেহের বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। নগরজীবনে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া, গৃহহীনতা, একাকিত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
তার মতে, কোনো মরদেহের পেছনে অপরাধ বা হত্যাকাণ্ড রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিচয় শনাক্তে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার, হাসপাতাল, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা দরকার।