
সংগৃহীত ছবি
ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানিকে সাসটেইনেবিলিটি বা টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস’ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এই নিয়োগের পর বিশ্ববিদ্যালয়টির সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবেশবিদ, সংরক্ষণকর্মী ও কয়েকজন শিক্ষকের মধ্যে সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণী কল্যাণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে অনন্ত আম্বানির কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই তাকে এই সম্মানসূচক পদ দেওয়া হয়েছে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, তেল ও গ্যাস ব্যবসার বিশাল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী একজন ব্যক্তিকে টেকসই উন্নয়নের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়েছে।
কে এই অনন্ত আম্বানি?
৩১ বছর বয়সী অনন্ত আম্বানি ভারতের অন্যতম ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির ছেলে। মুকেশ আম্বানি রিলায়েন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান। তেল ও গ্যাসসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা রয়েছে এই শিল্পগোষ্ঠীর। গুজরাটের জামনগরে রিলায়েন্সের বিশাল তেল শোধনাগার কমপ্লেক্সও রয়েছে।
অনন্ত আম্বানি রিলায়েন্স গ্রুপের নির্বাহী পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের দায়িত্বে রয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৯০ বিলিয়ন পাউন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভান্তারা নিয়ে বিতর্ক
গুজরাটে পরিবারের তেল শোধনাগারের কাছাকাছি অনন্ত আম্বানি ‘ভান্তারা’ নামে একটি বিশাল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রাণী পরিচর্যা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। প্রায় ১ হাজার ৪০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই কেন্দ্রে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি প্রাণী রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে প্রায় ২০০টি সিংহ, ২৫০টি চিতাবাঘ এবং ৯০০টি কুমির রয়েছে বলেও জানা গেছে।
তবে বিভিন্ন সংরক্ষণবাদী সংগঠন অতীতে প্রশ্ন তুলেছে, এত বিপুলসংখ্যক প্রাণী—বিশেষ করে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী—কীভাবে ভান্তারায় এসেছে।
অবশ্য ভান্তারা কোনো অনিয়মের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়নি। আম্বানি পরিবার ও ভান্তারা বন্যপ্রাণী পাচারের অভিযোগও অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিপদগ্রস্ত প্রাণী উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং তাদের যত্ন নিশ্চিত করা।
‘এটা কি রসিকতা?’
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নিয়োগের খবর প্রকাশের পর ভারতসহ বিভিন্ন দেশের পরিবেশবিদ ও সংরক্ষণকর্মীদের মধ্যে বিস্ময় ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
ভারতের পরিবেশচিন্তাবিদ ও লেখক রামচন্দ্র গুহ নিয়োগটিকে ‘রহস্যময়’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, ভারতে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক গবেষক ও বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যারা এ ধরনের একাডেমিক স্বীকৃতির জন্য বিবেচিত হতে পারতেন।
বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে কাজ করা ভারতীয় গবেষক ভূবন ম্যাঙ্গালোর, যিনি ভান্তারা নিয়ে গবেষণা করছেন, এই নিয়োগ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘এটা কি রসিকতা?’
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠনের স্থানীয় শাখার প্রধান অধ্যাপক ম্যাট পেরিও জানিয়েছেন, পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এই নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ধনকুবেরদের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অধ্যাপক লাইলা মেহতাও এ নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারি অর্থায়ন কমে গেলে ধনী ব্যক্তি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থ একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব হলো ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা; তাদের একাডেমিক স্বীকৃতি দেওয়া নয়।
অনন্ত আম্বানির নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়
এপ্রিল মাসে অনন্ত আম্বানি ‘ভান্তারা ইউনিভার্সিটি’ চালু করেন। এটিকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ভেটেরিনারি বিজ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের প্রথম বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে, নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় অনন্ত আম্বানিকে ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস’ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পক্ষে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির মতে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য এবং প্রাণী কল্যাণে তার কাজ এই স্বীকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।