
চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের মৌসুম শেষপ্রান্তে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, মৌসুমের শেষদিকে বাজারে বেচাকেনায় গতি ফিরলেও পুরো মৌসুমে অধিকাংশ চাষি উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি। ফলে বছরের শেষ বাজারেও আমের শুঘ্রাণ থাকলেও অনেক চাষির মুখে রয়ে গেছে হতাশার ছাপ। তবে ফড়িয়া ব্যাবসায়ীরা বরাবরের মতো এবাও ভাল ব্যাবসা করেছেন।
তবে মৌসুমের শেষভাগে আশ্বিনা, বারি-৪, বারি-৮, গৌড়মতি, কাটিমন ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোসহ বিভিন্ন নাবি ও বারোমাসি জাতের আমকে ঘিরে জেলার বৃহত্তম কানসাট আমের বাজারে আবারও প্রাণ ফিরেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মণ আমের বেচাকেনা হচ্ছে। মৌসুমের শেষ সময়েও বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাটের আমচাষি আশরাফুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমের শেষ মূহুর্তে কাটিমন আম ৬ হাজার থেকে আট হাজার মন দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় এ দাম সন্তোষজনক নয়।
আরেক আমচাষি আবদুস সালাম জানান, আম্রপালি আম প্রতি মণ বিশ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। কয়েক বছর আগেও একই জাতের আমের দাম আরও বেশি পাওয়া যেত। কিন্তু এবার প্রথম দিকে প্রত্যাশিত মূল্য না পাওয়ায় অনেক চাষিই হতাশ।
আমচাষি গোলাম নবী ব্যানানা ম্যাঙ্গো নিয়ে বাজারে এসে প্রতি মণ ৬ হাজার টাকা দাম চাইলেও ক্রেতার চাপে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করেন।
কানসাটে দীর্ঘ এক যুগ ধরে অনলাইনে আমের ব্যবসা করে আসছেন ব্যবসায়ী মো. ওয়াহিদ। তিনি বলেন, মৌসুমের মাঝামাঝি কয়েকদিন বাজার কিছুটা চাঙা ছিল। তবে মৌসুমজুড়ে বাজারে স্থিতিশীলতা ছিল না। তবে চলতি বছর লাভজনক ব্যাবসা করেছেন।
শিবগঞ্জের আমচাষি ইসমাইল হোসেন খান বলেন, জেলার অন্য চার উপজেলার সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়েও বেশি আম উৎপাদন হয় শিবগঞ্জ উপজেলায়। একসময় এখানকার প্রায় ৮০ শতাংশ বাগানে ফজলি আমের চাষ হলেও বর্তমানে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেক চাষি ফজলির পরিবর্তে নতুন জাতের আমের চাষে ঝুঁকছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কৃষি উদ্যোক্তা মুঞ্জের আলম বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে কৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আমচাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ মিলছে না। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারমূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি।
তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরসাপাতি, ল্যাংড়া, ফজলি ও আশ্বিনা আম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। জেলার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা আমের সঙ্গে জড়িত। তাই এ খাতকে টিকিয়ে রাখতে আম প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা, গবেষণা কার্যক্রম জোরদার এবং একটি পূর্ণাঙ্গ আম গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।
বর্তমানে কানসাট আমের বাজারে আশ্বিনা আম প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বারি-৪ ১৫০ টাকা থেকে ১৮০, গৌড়মতি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, কাটিমন ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে মণ হিসেবে কিনলে দাম কিছুটা কম পড়ে।
ঢাকা থেকে আসা আম ব্যাপারী মোরশেদ খান জানান তিনি সরাসরি আমের মান দেখে কানসাট আড়তদারদের কাছে আম ক্রয় করেন। ভাল পরিচর্যায় ঢাকায় আম পাঠাতে পারলে আর কোন রিক্স থাকেনা। তিনি বংশ পরম্পরায় আমের ব্যাবসায়ী। তবে চলতি বছর কিছু কিছু আমে পচন ক্রিয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ বছর তিনি লাভে আছেন বলে জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। মৌসুমের শেষভাগেও বাজারে নাবি জাতের আমের সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।