
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষা প্রশাসনে নতুন উদ্দীপনা, কর্মগতিশীলতা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা ও শিক্ষাবিদ। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি এবং নেতৃত্বের সংকট কাটিয়ে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও গতিশীল প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছেন প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের গত ১৬ এপ্রিল জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে মাউশির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ফাইল নিষ্পত্তি, মাঠপর্যায়ের সমস্যার দ্রুত সমাধান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় এবং শিক্ষা খাতের সংস্কার কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি আলোচনায় আসেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত মহাপরিচালকের অনুপস্থিতিতে শিক্ষা প্রশাসনে যে স্থবিরতা ও নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছিল, ড. সোহেলের যোগদানের পর তা অনেকাংশেই দূর হয়েছে। বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রশাসনের অভ্যন্তরে সমন্বয় বাড়াতে তার উদ্যোগ ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে।
শিক্ষা ক্যাডারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, "ড. সোহেল প্রশাসনিক দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে মাউশির কার্যক্রমে নতুন গতি এনেছেন। তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেন, যা প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।"
বিসিএস ১৬তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার নানা স্তরে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও পদোন্নতিতে তিনি বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি পেশাগত সততা, দক্ষতা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা খান বলেন, শিক্ষা প্রশাসনের পুনর্গঠন ও চলমান সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নে ড. সোহেলের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে শিক্ষকতা থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যা, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখেন। ফলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্তগুলো অধিকতর কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর বহনকারী। ১৯৮৪ সালে কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইউজিসি ফেলোশিপ লাভ করেন।
২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি মাউশির মাধ্যমিক পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি শিক্ষা ক্যাডার সমিতির আহ্বায়ক হিসেবে মনোনীত হন। শিক্ষা প্রশাসনে তার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং সংস্কারমুখী দৃষ্টিভঙ্গি তাকে একজন বিচক্ষণ প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সম্প্রতি তাকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা ও প্রচারণাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ বিষয়ে শিক্ষা প্রশাসনের একটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছে, যেকোনো প্রশাসনিক সংস্কার কার্যক্রমের সময় মতভিন্নতা বা সমালোচনা থাকতেই পারে। তবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারণার পরিবর্তে তথ্যনির্ভর মূল্যায়ন এবং গঠনমূলক সমালোচনাই শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পর্যায়ে নিয়ে যেতে দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের বিকল্প নেই। সেই বিবেচনায় প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের নেতৃত্বে মাউশি নতুন কর্মপরিকল্পনা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবেন এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট মহলের।