
ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে চুরি, ছিনতাই কিংবা ঘটনায় খোয়া যাওয়া স্মার্টফোন সীমান্ত পেরিয়ে নিয়মিত ঢুকছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সেখান থেকে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, মোবাইল দোকান ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সেগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। সীমান্তে বিজিবির নিয়মিত অভিযান ও পুলিশের ধরপাকড় সত্ত্বেও থামছে না এই অবৈধ ব্যবসা। বরং প্রযুক্তির ব্যবহার ও অনলাইনভিত্তিক বিক্রির কারণে সিন্ডিকেটটি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা পুলিশ ও বিজিবির পৃথক দুটি অভিযানে মোট ২২টি চোরাই ও অবৈধ ভারতীয় মোবাইল ফোনসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা সীমান্ত এবং সদর মডেল থানাধীন মহানন্দা পুরাতন সেতু এলাকায় পরিচালিত এসব অভিযানে চোরাই মোবাইল পাচারচক্রের সক্রিয়তার আরও একটি চিত্র সামনে এসেছে প্রথম অভিযানটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের মনাকষা গ্রামের মাস্তানমোড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই ব্যক্তিকে আটক করে। বিজিবি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মনাকষা বিওপির একটি বিশেষ টহলদল ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করে। তল্লাশিতে তাদের কোমরে লুকানো অবস্থায় ৮টি ভারতীয় মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তাদের ব্যবহৃত আরও ২টি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন এবং যাতায়াতের কাজে ব্যবহৃত ১টি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়। জব্দকৃত মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেলের সর্বমোট আনুমানিক বাজারমূল্য ৩ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৯ টাকা। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জব্দকৃত মালামালসহ শিবগঞ্জ থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযানে একই দিন রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ শিবগঞ্জ-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের মহানন্দা পুরাতন সেতুর টোলঘর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালিয়ে ১২টি চোরাই ও অবৈধ ভারতীয় মোবাইল ফোনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন, গোমস্তাপুর উপজেলার নামো কাঞ্চনতলার মো. শাজাহান আলী (২৮), সদর মডেল থানার মহারাজপুর পূর্ব-শেখপাড়ার মো. দেলোয়ার হোসেন (৪০) এবং সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার সাহেবগঞ্জ নলকা গ্রামের মো. আতাউর রহমান (৩০)।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় ১৮৪ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে সক্রিয় চোরাকারবারিরা ভারতের মালদহ, মুর্শিদাবাদসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে চোরাই ও ব্যবহৃত মোবাইল সংগ্রহ করে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এসব মোবাইল প্রথমে সীমান্তবর্তী নিরাপদ ঘাঁটিতে রাখা হয়। পরে স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শিবগঞ্জ, কানসাট, মনাকষা, সাহাপাড়া, রানীহাটি, মহারাজপুর, রামচন্দ্রপুর এবং শহরের মোবাইল মার্কেটসহ বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে চুরি, ছিনতাই এর ঘটনায় খোয়া যাওয়া স্মার্টফোন সীমান্ত পেরিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রবেশ করে স্থানীয় একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, মোবাইল দোকান এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। সীমান্তে বিজিবির নিয়মিত অভিযান ও পুলিশের ধরপাকড় সত্ত্বেও থামছে না এই অবৈধ ব্যবসা। বরং প্রযুক্তির ব্যবহার ও অনলাইনভিত্তিক বিক্রির কারণে সিন্ডিকেটটি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
কানসাট, শিবগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের কয়েকজন অসাধু মোবাইল ব্যবসায়ী, সার্ভিসিং সেন্টারের মালিক এবং সীমান্ত চোরাকারবারিরা মিলে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। তারা সীমান্ত দিয়ে আসা ফোন দ্রুত হাতবদল করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে দেয়। সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে দায়িত্বও ভাগ করা রয়েছে, কেউ সীমান্ত থেকে ফোন সংগ্রহ করে, কেউ স্থানীয় বাজারে মজুত রাখে, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতা সংগ্রহ করে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুক পেজ, বাই-সেল গ্রুপ এবং ব্যক্তিগত আইডি ব্যবহার করে "বিদেশি ফোন", "ডিসপ্লে সেট", "বক্স ছাড়া", "কম দামে আইফোন" কিংবা "জরুরি বিক্রি" শিরোনামে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। ক্রেতারা যোগাযোগ করলে ইনবক্স বা মেসেঞ্জারে ফোনের ছবি, ভিডিও ও মূল্য পাঠানো হয়।
মাঠপর্যায়ের এক ব্যবসায়ী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, জানান ভারত থেকে আসা চোরাই চালানে সবচেয়ে বেশি থাকে আইফোন, স্যামসাং, ভিভো, অপো, রেডমি, শাওমি, রিয়েলমি ও ওয়ানপ্লাস ব্র্যান্ডের মোবাইল। বাজারমূল্যের তুলনায় কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টাকা কম দামে বিক্রি হওয়ায় অনেকেই ঝুঁকি জেনেও এসব ফোন কিনছেন।
শিবগঞ্জের এক ক্রেতা জানান, বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় সাত হাজার টাকা কম দামে একটি ভারতীয় ফোন কিনেছিলেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ ব্যবহারের পর সেটি নেটওয়ার্ক হারিয়ে ফেলে। পরে সার্ভিসিং সেন্টারে গিয়ে জানতে পারেন ফোনটির উৎস সন্দেহজনক এবং সেটি আর স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তেলকুপি বিওপির ইকবালপুর ও শিকারী বিওপির চামুচা সীমান্তে পৃথক অভিযান চালিয়ে ৫৩ বিজিবি ২৯টি ভারতীয় মোবাইল জব্দ করে।
এরপর জুন মাসে ভোলাহাট সীমান্তে পৃথক অভিযানে আরও ১৬টি ভারতীয় মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি) সীমান্তজুড়ে বিশেষ নজরদারি ও টহল জোরদার করে। ১০ জুন শিবগঞ্জ সীমান্তে পরিচালিত এক অভিযানে ৯টি ভারতীয় মোবাইল ফোন, একটি মোটরসাইকেল এবং এক চোরাকারবারিকে আটক করা হয়।
জুলাই মাসে চোরাই মোবাইলবিরোধী অভিযানে সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যায়। মাসজুড়ে ৫৩ বিজিবি, ৫৯ বিজিবি এবং জেলা পুলিশ পৃথক পৃথক অভিযান পরিচালনা করে। ৫৩ বিজিবির তথ্যমতে, শুধু জুলাই মাসেই বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে মোট ৬৬টি ভারতীয় মোবাইল ফোন জব্দ এবং তিনজনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে ২৮ জুলাই শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা সীমান্তে বিশেষ অভিযানে আটটি ভারতীয় চোরাই মোবাইল, আটক ব্যক্তিদের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল এবং একটি মোটরসাইকেলসহ দুইজনকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে শিবগঞ্জ থানায় চোরাচালান আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই মাসে উদ্ধার হওয়া ৬৬টি মোবাইলের মধ্যে ৫৫টি কাস্টমস অফিসে এবং ১১টি থানায় জমা দেওয়া হয়েছে।
চোরাই মোবাইল বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য চোরাকারবারিরা কয়েকটি নির্দিষ্ট সীমান্ত রুট নিয়মিত ব্যবহার করছে। এর মধ্যে শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, শাহাবাজপুর, তেলকুপি ও শিকারী বিওপি এলাকা, ভোলাহাট সীমান্ত, আজমতপুর এবং সোনামসজিদ স্থলবন্দরসংলগ্ন অঞ্চল বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে চিহ্নিত। এসব সীমান্ত দিয়ে মোবাইলগুলো প্রথমে স্থানীয় দালাল ও রিসিভারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়ন (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সীমান্ত দিয়ে চোরাই মোবাইলসহ সব ধরনের পণ্য পাচার রোধে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। চোরাচালান প্রতিরোধে সীমান্তে টহল জোরদারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন (মহানন্দা)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী, এসজিপি, বিএফএম, পিএসসি বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন পণ্য দেশে প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবির এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।