বৃহস্পতিবার ● ৫ নভেম্বর ২০২৬ ● ২০ কার্তিক ১৪৩৩

শিরোনাম: ঝিকরগাছায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২ উদ্বোধন অনুষ্ঠিত    শরণখোলায় ৩১৫ পিচ ইয়াবাসহ এক মাদককারবারী আটক    অভিযোগের পাহাড় আহাদের বিরুদ্ধে, তবু বহাল স্বপদে এনবিআর কর্মকর্তা!   সংহতির রাজনীতি থেকে রাষ্ট্র-পুনর্গঠন: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদৃষ্টি ও অসমাপ্ত সংলাপ   ঈশ্বরগঞ্জে যুবদল নেতাকে হত্যার হুমকী প্রতিবাদে মানববন্ধন   চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্ন, ভালো ফলের বিপরীতে একাধিক প্রতিষ্ঠানে বিপর্যয়   ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নতুন নেতৃত্বকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন   
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্ন, ভালো ফলের বিপরীতে একাধিক প্রতিষ্ঠানে বিপর্যয়
এইচএসসিতে জেলায় পাসের হার ৩৮.৩৬ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৪৮ জন। পাঠদান ও তদারকির দুর্বলতাও
মোঃ সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ৩:২৪ পিএম   (ভিজিট : ৫৭)

শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। অথচ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাম্প্রতিক শিক্ষার চিত্রে সাফল্যের পাশাপাশি উঠে এসেছে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ। ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় জেলায় পাসের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। কয়েকটি কলেজে পাসের হার নেমেছে ২০ শতাংশেরও নিচে। কোথাও আবার পাসের হার ১০ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে জেলার সর্বোচ্চ ৮৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে। ফলাফলের এই বৈপরীত্য শুধু পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতিকেই সামনে আনছে না, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, প্রশাসনিক তদারকি ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার ৯ হাজার ৮২০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩ হাজার ৭৬৭ জন। মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৪৮ জন। উত্তীর্ণদের মধ্যে ১ হাজার ৫৬১ জন ছাত্র এবং ২ হাজার ২০৬ জন ছাত্রী। অর্থাৎ পাসের সংখ্যায় ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ৬৪৫ জন এগিয়ে রয়েছেন।

কলেজভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, পাসের হারে জেলার শীর্ষে রয়েছে নাচোলের এশিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির ৪৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৪১ জন। পাসের হার ৮৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পুঠুরিয়া মহিলা কলেজের ১৫৬ জনের মধ্যে পাস করেছেন ১৩০ জন। পাসের হার ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজে ৮৮১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬৬৭ জন। পাসের হার ৭৫ দশমিক ৭১ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায় প্রতিষ্ঠানটি জেলার সব কলেজের শীর্ষে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে পাসের হার ৬১ দশমিক ২১ শতাংশ এবং গোপালতলা মহিলা কলেজে ৫৫ দশমিক ১০ শতাংশ।

এর বিপরীতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল অত্যন্ত হতাশাজনক। পার্বতীপুর এসবি আদর্শ কলেজে পাসের হার ১৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ, সাহাপাড়া পারভীন স্মরণী টেকনিক্যাল কলেজে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, নাচোল সরকারি কলেজে ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং নামোশংকরবাটী কলেজে মাত্র ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। রাধানগর বরেন্দ্র কলেজে পাসের হার আরও কম, মাত্র ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ভোলাহাট কলেজে মানবিক বিভাগের একজন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এর আগের দুই বছর ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও প্রতিষ্ঠানটি থেকে কেউ পাস করেননি।

শুধু সাধারণ শিক্ষায় নয়, মাদরাসা শিক্ষায়ও একই ধরনের দুর্বলতার চিত্র দেখা গেছে। আলিম পরীক্ষায় জেলার ২৭টি মাদরাসার মধ্যে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান থেকে দুজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। শংকরবাটি হেফজুল উলুম ফায়েজা খানম কামিল মাদরাসার বিজ্ঞান বিভাগের ওই দুই শিক্ষার্থী এ সাফল্য অর্জন করেন। বাকি ২৬টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাননি। ঝলঝলিয়া ইসলামী সমাজকল্যাণ আলিম মাদরাসায় ১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র একজন। কয়েকটি মাদরাসায় পাসের হার ২০ শতাংশেরও নিচে।

এমন ফলাফলের পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা বা পরীক্ষার প্রস্তুতির ঘাটতিকে দায়ী করার সুযোগ নেই। নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি না, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন, পাঠদানের মান কতটা কার্যকর এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কতটা জবাবদিহিমূলক—এসব বিষয়ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অনেক শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় বা কলেজের নিয়মিত পাঠদানের পরিবর্তে কোচিং ও ব্যক্তিগত শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার প্রবণতাও উদ্বেগজনক। এতে অভিভাবকদের বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ বুঝে নেওয়ার সুযোগ না পেলে শিক্ষার্থীদের দায়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগে তদন্তের ঘটনাও সামনে এসেছে। শিবগঞ্জে শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু এবং নাচোলের একটি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষার মান নির্ধারণে পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই একমাত্র মাপকাঠি নয়। একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করলেই সে দায়িত্বশীল, মানবিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন নাগরিক হয়ে উঠেছে, এমনটি বলা যায় না। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অনলাইন আসক্তি, অশালীন বিষয়বস্তু, সহিংসতার প্রবণতা, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো সমস্যাও শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠায় প্রভাব ফেলছে। এসব ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার নম্বরের জন্য প্রস্তুত না করে চিন্তাশক্তি, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলাও জরুরি।

ফলাফল বিপর্যয়ের বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাহীন সুলতানা বলেন, এবার সারা দেশেই শিক্ষার্থীরা আশানুরূপ ফল করতে পারেননি। বিগত কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ঘাটতি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ বা দায় নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা, শিক্ষকস্বল্পতা দূর করা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম তদারকি এবং প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে ফলাফল খারাপ হচ্ছে, সেগুলোর কারণ আলাদাভাবে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও তদারকি বাড়ানো জরুরি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ব্যর্থ, এমনটি বলার সুযোগ নেই। এ জেলায় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন অসংখ্য শিক্ষক, পরিশ্রম করছেন হাজারো শিক্ষার্থী এবং ভালো ফলাফল ধরে রেখেছে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু একই জেলার কোনো প্রতিষ্ঠানে পাসের হার প্রায় ৯০ শতাংশ, আবার কোথাও তা ৭ শতাংশের নিচে, এই ব্যবধান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেই শিক্ষার মান বাড়ে না। জিপিএ-৫-এর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য শুধু সার্টিফিকেট অর্জনে নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীকে যোগ্য, সচেতন ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত।









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]