
প্রতীকী ছবি
প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সহজলভ্যতার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে অপরাধের ধরন। সাইবার অপরাধের পাশাপাশি মাদক, হত্যা, চুরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার তদন্তেও এখন ডিজিটাল ফরেনসিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণ করে অনেক জটিল ও ক্লুলেস মামলার রহস্যও উদ্ঘাটন হচ্ছে। ফলে তদন্তে জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সংখ্যা বাড়ছে দ্রুতগতিতে।
তবে সেই তুলনায় পুলিশের ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা না বাড়ায় দীর্ঘ হচ্ছে আলামতের জট। সময়মতো ফরেনসিক প্রতিবেদন না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বর্তমানে মামলার তদন্তে ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের সুবিধা রয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডিতে)। সংস্থাটির সদর দপ্তর ও খুলনা বিভাগীয় ল্যাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াও ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ফরেনসিক সেবা নিয়ে থাকে। ২০১২ সালে ঢাকায় এবং ২০২২ সালে খুলনায় চালু হওয়া এসব ল্যাবে বর্তমানে আলামতের চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে। আলামতের ধরন অনুযায়ী ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য এর ব্যতিক্রম রয়েছে।
সিআইডির ডিজিটাল ফরেনসিকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে ঢাকা ও খুলনা ল্যাবে ২৬ হাজার ৯৪২টি মামলার বিপরীতে ৭৯ হাজার ১৪৪টি ডিজিটাল আলামত গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৯৪৩টি মামলার ৫৫ হাজার ৯৫৭টি আলামত নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে দুই ল্যাবে ২৫ হাজার ৫৬৪টি ডিজিটাল আলামত ঝুলে আছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ডিভাইস বিশ্লেষণের জন্য আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে। ওই বছর নিষ্পত্তির হার ছিল ৯০ শতাংশের বেশি। তবে ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে প্রায় ৫০ শতাংশে। অর্থাৎ চলতি বছর করা আবেদনের প্রায় অর্ধেকই এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ফরেনসিক প্রতিবেদনের জন্য আবেদনকারীদের গড়ে ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সক্ষমতা না বাড়ালে এ অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে। কারণ পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে সর্বশেষ সংস্করণের ডিভাইস ও অ্যাপ্লিকেশনের তথ্য বিশ্লেষণ করা কঠিন। বিশেষ করে এনক্রিপ্টেড অ্যাপ্লিকেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় ফরেনসিক বিশ্লেষণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালে সাতটি মামলায় ১৮টি আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে শতভাগ নিষ্পত্তি করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে ২৪টি মামলায়ও নিষ্পত্তির হার ছিল ১০০ শতাংশ। এরপর ২০১৪ সালে ৫৮টি মামলায় ২২ দশমিক ৪১ শতাংশ, ২০১৫ সালে ২৫৭টি মামলায় ৭১ দশমিক ৬০ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৫৩৩টি মামলায় ৫৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে ১ হাজার ১০৮টি মামলায় ৯০ দশমিক ০৭ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়।
২০১৮ সালে ১ হাজার ১০৬টি মামলায় নিষ্পত্তির হার ছিল ৮৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০১৯ সালে ১ হাজার ৬০২টি মামলায় ৫৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ২০২০ সালে ২ হাজার ৫৯০টি মামলায় ৬৪ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৩ হাজার ৫৭৯টি মামলায় ৮২ দশমিক ৯৫ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়। ২০২২ সালে ৩ হাজার ৫৬৫টি মামলায় নিষ্পত্তির হার ছিল ৭৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৫৬১টি মামলায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ দশমিক ১৭ শতাংশে।
২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৫৯টি মামলায় ৮৬ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯০টি মামলায় ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ আলামত নিষ্পত্তি হয়েছে। আর ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৬০৩টি মামলায় নিষ্পত্তির হার দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ১৩ শতাংশে।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত তথ্য আরও বলছে, ২০১২ সালের তুলনায় ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের চাহিদা বেড়েছে ৩৭২ গুণ। ২০১২ সালে যেখানে সাতটি মামলায় ১৮টি আলামত বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৬০৩টি মামলায় ১১ হাজার ১১১টি আলামত জমা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলেকট্রনিক আলামতের ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় তদন্ত কর্মকর্তারা নির্ধারিত সময়ে আদালতে অভিযোগপত্র দিতে পারছেন না। এতে অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক প্রমাণ নষ্ট বা গোপন করার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। এর ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
এর একটি উদাহরণ পাওয়া যায় ২০২৫ সালের অক্টোবরের একটি নিয়োগ পরীক্ষার মামলায়। ওই পরীক্ষায় অন্য এক প্রার্থীর হয়ে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে অংশ নেওয়া এক ভুয়া পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়। ওই দিনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থানায় মামলা করে এবং পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।
তদন্তে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থী এবং অন্যজন মধ্যস্থতাকারী। গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্তদের ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইস ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়। ফরেনসিক প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং অপরাধসংশ্লিষ্ট তথ্য আদান-প্রদানের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে প্রতিবেদন পেতে তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রায় আট মাস অপেক্ষা করতে হয়। পরে গত জুলাইয়ে তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
পুলিশের সাইবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন ডিজিটাল সূত্র ব্যবহার করে সাইবার অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা হয়। অপরাধ প্রমাণে অভিযুক্তদের ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে এসব প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে অপরাধী ও তার অন্য অপরাধ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। ফলে প্রতিবেদন পেতে বিলম্ব হলে শুধু মামলার তদন্তই দীর্ঘ হয় না, অপরাধসংক্রান্ত অতিরিক্ত তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়।
ফরেনসিক ল্যাবের কর্মকর্তারা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতির চারটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও নতুন ধরনের সাইবার অপরাধের বিস্তার, এনক্রিপ্টেড ডিভাইস ও আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য উদ্ধারের জটিলতা, ল্যাবের সক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি মামলা ও আলামতের চাপ এবং আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি।
সিআইডির মিডিয়া শাখার সদ্য সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান তার দায়িত্বকালে জানিয়েছিলেন, এই সংকট কাটাতে দেশের প্রতিটি বিভাগে ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে কোরিয়ান সংস্থা কোইকার সহায়তায় চট্টগ্রামে বিভাগীয় ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। শিগগিরই ল্যাবটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এটি চালু হলে চট্টগ্রাম বিভাগের মামলাগুলোর ডিজিটাল আলামত দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব হবে এবং দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।