
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজ যে দলেরই হোক, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্প্রতি নিজ দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাকে সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন অনেকে। এর মধ্য দিয়ে অপরাধের অভিযোগে দলীয় নেতাকর্মীদের ছাড় না দেওয়ার বিষয়ে সরকারের অবস্থান সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে অতীতে বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী ও কক্সবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিকে ঘিরেও বিভিন্ন সময়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ও বিতর্ক ছিল। সমালোচকদের মতে, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে অতীতে অনেক অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন। এতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হয়েছে এবং রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফেরার পর তারেক রহমান দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রেখে বিচারের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম আলোচনায় আসে। এ ঘটনার পর বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। দ্রুত পদত্যাগ না করলে দলীয়ভাবে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও জানানো হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলগুলো অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলেও শাস্তি এড়ানো সম্ভব। এ ধরনের ধারণা শুধু নির্দিষ্ট দলের নয়, সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছেন। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়া কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও বিএনপি সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছিল। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ায় তাঁদের কাউকে কাউকে বহিষ্কার করা হয়।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দলটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে নেতাকর্মীদের বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির দাবি, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনা দলীয় জবাবদিহির প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপের কার্যকারিতা নির্ভর করবে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতার ওপর।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নিজেদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি জনসাধারণের আস্থা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে শুধু ঘোষণা নয়, বরং স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ প্রয়োজন। দলীয় পর্যায়ে নেওয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো সেই ধারাবাহিকতায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে, তা ভবিষ্যতের কর্মকাণ্ডেই স্পষ্ট হবে।