
রাজপথের আন্দোলন, একের পর এক মামলা, গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে বিএনপির ছাত্ররাজনীতিতে আলোচিত নাম মো. সোহাগ ভূঁইয়া। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার সভাপতি। আসন্ন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে তার নাম আবারও জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে।
দলীয় সূত্র এবং ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় সোহাগ ভূঁইয়াকে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকারবিরোধী আন্দোলন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাঁর ধারাবাহিক উপস্থিতি তাঁকে যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আলোচনায় এনেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
কুমিল্লার সন্তান সোহাগ ভূঁইয়ার রাজনৈতিক উত্থান মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিকে ঘিরে। বিএনপির হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে ২০১৩-১৪ সালে রাজপথে সক্রিয় থাকার মধ্য দিয়ে তিনি আলোচনায় আসেন। শাহজাহানপুর থানা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তার সাংগঠনিক পরিচিতি তৈরি হয়। পরে ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, এক নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সর্বশেষ সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঘোষিত ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের আংশিক কমিটিতে সভাপতি হিসেবে সোহাগ ভূঁইয়ার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এরপর রাজধানীর ছাত্ররাজনীতিতে তার সাংগঠনিক তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হয় বলে দলীয় নেতা-কর্মীরা জানান।
দলীয় সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় সোহাগ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ৭৬টির বেশি মামলা হয়। বিভিন্ন সময়ে তাকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর সহকর্মীরা জানান। বিএনপি ও ছাত্রদলের অবরোধ, বিক্ষোভ ও মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার কারণে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি ‘মাঠের কর্মী’ হিসেবে পরিচিতি পান।
২০১৮ সালে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোহাগ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা এবং তার পরিবারের সদস্যদের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।
তার সহকর্মীদের দাবি, তাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁর পরিবারের ২১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তাঁকে কয়েক দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে রাখা হয় বলেও তারা দাবি করেন।
সোহাগ ভূঁইয়ার রিমান্ডের অভিজ্ঞতা নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়। তার এক সাবেক সহযোদ্ধার স্মৃতিচারণে সে সময়ের আতঙ্ক, মানসিক চাপ ও নির্যাতনের কথা উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দলীয় সূত্রে আরও জানা যায়, সোহাগ ভূঁইয়া ১০ বারের বেশি কারাবরণ করেছেন। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর মধ্যে একটি মামলায় ১০ বছর তিন মাসের সাজা হয়েছিল বলেও দলীয় সূত্র দাবি করেছে।
২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনি গ্রেপ্তার হন বলে তাঁর সহকর্মীরা জানান। ২০২৩ সালের ২৯ জুলাই ও ২৮ অক্টোবরের কর্মসূচিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কথাও দলীয় নেতা-কর্মীরা উল্লেখ করেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনেও শাহবাগ, খিলগাঁও, রামপুরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁকে রাজপথে দেখা গেছে বলে তার সহকর্মীরা জানান। কাকরাইলে আন্দোলনের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বলেও তাদের দাবি। এ কারণে জুলাইয়ের আন্দোলনেও তিনি আলোচনায় আসেন।
বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতাদের মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেতাদের যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠের অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। এ হিসাব-নিকাশে সোহাগ ভূঁইয়ার নামও আলোচনায় রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও সোহাগ ভূঁইয়াকে সক্রিয় দেখা গেছে। মহানগর পূর্বের আওতাধীন বিভিন্ন ইউনিটের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও পুনর্গঠন, ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং গ্রেপ্তার-নির্যাতনের প্রতিবাদে আয়োজিত কর্মসূচিতেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
যুবদলের সম্ভাব্য কমিটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেন্দ্র এমন নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিতে চায়, যারা মাঠে সক্রিয়, সাংগঠনিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং কেন্দ্রের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সক্ষম। এসব বিবেচনায় সোহাগ ভূঁইয়াকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদের অন্যতম দাবিদার হিসেবে দেখছেন তাঁর অনুসারীরা।
তবে এই পদে একাধিক সাবেক ছাত্রনেতা ও যুবদলের পুরোনো নেতার নামও আলোচনায় রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত কে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নির্ভর করবে বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের ওপর। এর মধ্যেই তৃণমূল ও দলীয় নেতা-কর্মীদের আলোচনায় সোহাগ ভূঁইয়ার নাম গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোহাগ ভূঁইয়া বলেন, ‘দল আমাকে যে দায়িত্ব দেবে, ইনশা আল্লাহ, সেটি যথাযথভাবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করব। পদ-পদবি নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া নেই। সব ক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্তই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে দলের হাইকমান্ড ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটিই চূড়ান্ত।’