
দেশের ২৪তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৩ আগস্ট, যাচাই-বাছাই শেষে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণার পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন?
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কে আসছেন, তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ক্ষমতাসীন বিএনপি যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই কার্যত দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। এর আগে জাতীয় সংসদ সচিবালয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের নামসংবলিত ভোটার তালিকা নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠায়। পরে ইসি ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যকে নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কেবল জাতীয় সংসদের সদস্যরাই ভোট প্রদান করেন।
সবচেয়ে আলোচনায় মির্জা ফখরুল:
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং কঠিন সময়ে দলের ঐক্য ধরে রাখার ভূমিকার কারণে তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন।
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, বিএনপি এবার কোনো অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে নয়, বরং দলের ভেতর থেকে একজন পরীক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি করতে চায়। সে বিবেচনায় মির্জা ফখরুলই সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন।
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। খালেদা জিয়া কারাবন্দি এবং তারেক রহমান বিদেশে অবস্থানকালে দেশে আন্দোলনের নেতৃত্বে দৃশ্যমান মুখ ছিলেন মির্জা ফখরুল। দলের ভেতরে ও বাইরে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং সংযত রাজনৈতিক আচরণও তাকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির রাজনৈতিক হিসাব:
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের সময়ে এই পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের পর রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ কারণে বিএনপি এমন একজন ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি করতে চায়, যিনি একদিকে দলের প্রতি আস্থাশীল, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য।
আলোচনায় আরও কয়েকটি নাম:
মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান এবং নজরুল ইসলাম খান-এর নামও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্য যেকোনো নামের তুলনায় মির্জা ফখরুলের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরেও আলোচনা:
রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি, কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষ ভাবমূর্তির কারণে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তার মতো একজন ব্যক্তিত্ব দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করতে পারেন।
তবে বিএনপির ভেতরে এ নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। অনেকের মতে, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দলীয় নেতাদের মধ্য থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা উচিত।
জামায়াত দিচ্ছে না কোনো প্রার্থী:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দেবে না। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় প্রার্থী দিলেও নির্বাচিত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা নেই। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সরকারি দল বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা মতবিনিময় করেনি।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব:
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেই নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বিএনপির উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেছেন, রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত, যিনি রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত এবং দলের আদর্শের প্রতি আস্থাশীল।
এদিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, দলের গঠনতন্ত্র ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যথাসময়ে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।
সহজ সমীকরণ, নাকি শেষ মুহূর্তে চমক?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা থাকলেও সংখ্যার হিসাব বলছে, সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর জয় প্রায় নিশ্চিত। তবে শেষ মুহূর্তে দলটি কি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই বঙ্গভবনে পাঠাবে, নাকি সবাইকে চমকে দিয়ে নতুন কোনো নাম ঘোষণা করবে এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে মনোনয়ন ঘোষণার মধ্য দিয়েই।
এখন রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, দেশের ২৪তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সহজ সমীকরণই বাস্তবতা হয়ে ওঠে, নাকি শেষ মুহূর্তে আসে নতুন কোনো চমক।