
সাতক্ষীরা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বহুতল ‘ব্লিস হাসপাতাল’ এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ ছড়ানো কাল ধোঁয়া, জানালার কাঁচ ভেঙে বেরিয়ে আসা আগুনের লেলিহান শিখা আর স্বজনদের বোবা আর্তনাদে মুহূর্তের মধ্যেই হাসপাতাল এলাকা পরিণত হয় এক নরককুণ্ডে। জীবন বাঁচাতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও জরুরি বিভাগের মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে স্বজনদের দিকবিদিক ছোটাছুটিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুর ১টা ১৩ মিনিটের দিকে সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের পলাশপোল চৌরঙ্গী মোড়ে অবস্থিত ওই বহুতল বেসরকারি হাসপাতালটিতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় জনতার যৌথ প্রচেষ্টায় শতাধিক রোগীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বিজিবি ও দায়িত্বশীল সূত্রে খবর, এ ঘটনায় বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি না ঘটলেও নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও রোগীর স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে, দুপুরের দিকে হঠাৎ করেই নিচতলার অক্সিজেন লাইন বা গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে বিকট শব্দে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ভবনের উপরের তলাগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভবনের কাঁচের গ্লাস ভেঙে আগুনের শিখা বাইরে আসতে দেখে পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্ঘটনার সময় হাসপাতালে অন্তত ১০০ থেকে ১২০ জনের মতো রোগী ভর্তি ছিলেন। পুরো ভবন ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ায় আইসিইউ ও বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অসহায় রোগীরা শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে থাকেন। স্বজনদের চিৎকারে সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় জনতা ও হাসপাতাল কর্মীদের পাশাপাশি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সাতক্ষীরা ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিট। খবর পেয়েই বিজিবির সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়নের (৩৩ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান এর নেতৃত্বে বিজিবির ২ প্লাটুন সদস্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
বিষাক্ত ধোঁয়ার তোয়াক্কা না করে উদ্ধারকর্মীরা ভবনের ভেতরে থাকা আটকে পড়া রোগীদের একের পর এক বাইরে নিয়ে আসেন। বিশেষ করে আইসিইউ এবং জরুরি বিভাগে থাকা সংবেদনশীল রোগীদের পরম মমতায় বের করে আনা হয়। বিজিবি ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতালের সকল রোগীকে নিরাপদে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং আশপাশের অন্যান্য ক্লিনিকগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আহত ও আশঙ্কাজনক রোগীদের দ্রুত স্থানান্তরিত করতে মহাসড়কজুড়ে অ্যাম্বুলেন্সের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাতক্ষীরা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা তৎপর ছিলেন। ওসি জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও হাসপাতালজুড়ে প্রচুর বিষাক্ত ধোঁয়া জমা ছিল। দ্রুততার সাথে আহত ও অসুস্থদের হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরা ব্যাটালিয়নের (৩৩ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, দ্রুত ও সমন্বিত উদ্ধারের ফলে এখন পর্যন্ত বড় কোনো বড় ধরণের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরা ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবি জানায়, আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও হাসপাতালজুড়ে জমে থাকা ঘন ধোঁয়া বের করার চেষ্টা ও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করার কাজ চলছে। ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত শেষে অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ জানা যাবে।