বুধবার ১৭ জুন ২০২৬ ২ আষাঢ় ১৪৩৩

শিরোনাম: ম্যারাডোনার রেকর্ড ভাঙার দ্বারপ্রান্তে মেসি   খেলাধুলা নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: রাসুলুল্লাহ (সা.) কী বলেছেন   বিশ্বকাপে সমালোচনার ঝড়, মাঝ টুর্নামেন্টেই নিয়ম পাল্টাল ফিফা   গ্যাস সংকট মোকাবিলায় জুনে আসছে আরও ৪ এলএনজি কার্গো   বাংলাদেশ-পাকিস্তানে গিয়ে নামাজ পড়ার মন্তব্যে বিতর্কে বিজেপি মন্ত্রী   দামুড়হুদায় মাদক প্রতিরোধে গণসংযোগ ও র‍্যালি অনুষ্ঠিত   আমার বেড়ে উঠা, আমার বড় হওয়া   
খেলাধুলা নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: রাসুলুল্লাহ (সা.) কী বলেছেন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১২:৪৪ এএম   (ভিজিট : ৩৭)

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। মানুষের আত্মিক উন্নতির পাশাপাশি শারীরিক সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক সৌহার্দ্যের প্রতিও ইসলাম সমান গুরুত্ব প্রদান করেছে। তাই ইসলাম কখনো খেলাধুলাকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেনি; বরং এমন খেলাধুলাকে উৎসাহিত করেছে, যা শরীরকে শক্তিশালী করে, দক্ষতা বৃদ্ধি করে, আত্মরক্ষার যোগ্যতা গড়ে তোলে এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে।

বর্তমান যুগে খেলাধুলা অনেক সময় নিছক বিনোদন কিংবা পেশায় পরিণত হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সুস্থতা, উপকারিতা ও কল্যাণ অর্জন। নবী করিম (সা.)-এর জীবনাদর্শে আমরা এমন কিছু খেলাধুলা ও শারীরিক প্রশিক্ষণের দৃষ্টান্ত পাই, যা আজও মুসলিম সমাজের জন্য অনুসরণীয়।

খেলাধুলা সম্পর্কে ইসলামের নীতিমালা

ইসলাম খেলাধুলাকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করে—

১. হারাম বা নিষিদ্ধ খেলাধুলা

যেসব খেলায় জুয়া, অশ্লীলতা, সতর উন্মুক্ত হওয়া, অন্যায় প্রতিযোগিতা বা ফরজ ইবাদত অবহেলার কারণ সৃষ্টি হয়, সেগুলো হারাম।

২. অপছন্দনীয় খেলাধুলা

যেসব খেলা মানুষকে দ্বীনি দায়িত্ব থেকে গাফেল করে দেয় বা সময় অপচয়ের কারণ হয়।

৩. বৈধ ও প্রশংসনীয় খেলাধুলা

যেসব খেলাধুলা শরীরচর্চা, দক্ষতা অর্জন, আত্মরক্ষা ও কল্যাণকর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় এবং শরিয়তের সীমারেখা অতিক্রম করে না।

কুরআনের দিকনির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ

‘আর তারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা আল-মু'মিনুন: আয়াত ৩)

এই আয়াত থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, একজন মুমিনের সময় ও কর্ম হবে উদ্দেশ্যমূলক এবং কল্যাণকর। খেলাধুলাও তখনই প্রশংসনীয় হবে, যখন তা উপকারী ও অর্থবহ হবে।

নবীজি (সা.) যেসব খেলাধুলা উৎসাহ দিয়েছেন

১. তীরন্দাজি (Archery)

তীরন্দাজি ছিল ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রশিক্ষণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) তীর নিক্ষেপ শেখাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং এটিকে মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাদিসে পাকে এসেছে—

ارْمُوا وَارْكَبُوا، وَأَنْ تَرْمُوا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ تَرْكَبُوا

‘তোমরা তীর নিক্ষেপ করো এবং অশ্বারোহণ করো; তবে তোমাদের তীর নিক্ষেপ করাই আমার কাছে অধিক প্রিয়।’ (মুসলিম ১৯১৮)

তীরন্দাজি মনোযোগ, ধৈর্য, শারীরিক ভারসাম্য ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে।

২. অশ্বচালনা ও ঘোড়দৌড়

ঘোড়া ছিল সে যুগের প্রধান বাহন এবং যুদ্ধ প্রস্তুতির অন্যতম মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছেন। হাদিসে পাকে এসেছে—

عَنْ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ سَابَقَ بَيْنَ الْخَيْلِ

হজরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোড়াগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন।’ (বুখারি ২৮৭০)

এটি শারীরিক সক্ষমতা, সাহস ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে সহায়ক।

৩. সাঁতার শিক্ষা

সাঁতার একটি জীবনরক্ষাকারী দক্ষতা। ইসলাম মানুষের উপকারী জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ অর্জনে উৎসাহ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

كُلُّ شَيْءٍ لَيْسَ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ فَهُوَ لَهْوٌ أَوْ سَهْوٌ إِلَّا أَرْبَعَ خِصَالٍ... وَتَعَلُّمُ السِّبَاحَةِ

‘আল্লাহর স্মরণবিহীন সব কিছুই অনর্থক, তবে চারটি বিষয় ব্যতীত... তার মধ্যে রয়েছে সাঁতার শিক্ষা।’ (নাসাঈ ৮৯৪০)

সাঁতার শরীরের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সক্রিয় রাখে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৪. দৌড় প্রতিযোগিতা

রাসুলুল্লাহ (সা.) পরিবারে আনন্দ ও সৌহার্দ্য সৃষ্টির জন্য বৈধ বিনোদনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। হাদিসে পাকে এসেছে

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন—

سَابَقَنِي رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَسَبَقْتُهُ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন, তখন আমি তাঁকে হারিয়ে দিয়েছিলাম।’ (আবু দাউদ ২৫৭৮)

এ ঘটনা বৈধ বিনোদন ও পারিবারিক ভালোবাসার এক অনন্য শিক্ষা।

৫. কুস্তি বা মল্লযুদ্ধ

কুস্তি শক্তি, সহনশীলতা ও আত্মরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সীরাতগ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, নবীজি (সা.) মক্কার প্রসিদ্ধ মল্লযোদ্ধা রুকানাকে কুস্তিতে পরাজিত করেছিলেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, একজন মুমিনের শারীরিক শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ

‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।’ (মুসলিম ২৬৬৪)

৬. লক্ষ্যভেদ ও প্রশিক্ষণমূলক ক্রীড়া

যে সকল খেলাধুলা মানুষের দক্ষতা, মনোযোগ ও আত্মরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, ইসলাম সেগুলোকে উৎসাহিত করেছে। ঘোড়া প্রশিক্ষণ, লক্ষ্যভেদ এবং যুদ্ধ প্রস্তুতির বিভিন্ন অনুশীলন এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে পাকে এসেছে—

إِنَّ اللَّهَ يُدْخِلُ بِالسَّهْمِ الْوَاحِدِ ثَلَاثَةً الْجَنَّةَ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ একটি তীরের মাধ্যমে তিন ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন—তীর প্রস্তুতকারী, তীর নিক্ষেপকারী এবং যে তাকে সহযোগিতা করে।’ তিরমিজি ১৬৩৭)

খেলাধুলা থেকে ইসলামের শিক্ষা

ইসলামের দৃষ্টিতে খেলাধুলার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—

শারীরিক সুস্থতা অর্জন
আত্মরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি
দক্ষতা ও মনোযোগ উন্নয়ন
মানসিক প্রশান্তি লাভ
পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ় করা
উম্মাহর শক্তি ও প্রস্তুতি বৃদ্ধি
তবে অবশ্যই খেলাধুলা যেন—

নামাজ ও ইবাদতে বাধা সৃষ্টি না করে
অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা মুক্ত হয়
অহংকার ও বিদ্বেষের কারণ না হয়
জুয়া বা হারাম উপাদানমুক্ত থাকে

ইসলাম মানবজীবনের স্বাভাবিক চাহিদাকে অস্বীকার করে না; বরং সেগুলোকে সুশৃঙ্খল ও কল্যাণমুখী পথে পরিচালিত করে। খেলাধুলা ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল বিনোদন নয়, বরং শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা, আত্মরক্ষা এবং সামাজিক সৌহার্দ্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায় যে, একজন মুমিন যেমন ইবাদতে অগ্রগামী হবে, তেমনি সে হবে শক্তিশালী, কর্মক্ষম ও সুস্থ। তাই ইসলামের সীমারেখা মেনে উপকারী খেলাধুলার চর্চা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য কল্যাণকর এবং সুন্নাহসম্মত একটি অনুশীলন।










  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]