মঙ্গলবার ৯ জুন ২০২৬ ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

শিরোনাম: হামে ৬১০ শিশুর মৃত্যু: ড. ইউনূসসহ ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা খারিজ   মিরপুরে বৃষ্টি, ডিএলএস সমীকরণে এগিয়ে বাংলাদেশ   কক্সবাজারের চকরিয়ায় মা-মেয়েকে সঙ্ঘবদ্ধ ‘ধর্ষণ’   আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফনের সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ করল ইরান   হাম ও উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু   ২ রানেই দুই উইকেট হারিয়ে চাপে অস্ট্রেলিয়া   প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একই গাড়িতে সংসদে পার্থ   
অযথা রাত জাগা নিয়ে নবীজি (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ১০:১৩ এএম   (ভিজিট : ৬১)

আধুনিক জীবনের অন্যতম বড় সংকট হলো রাত জাগার অভ্যাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সিরিজ, কাজের চাপ কিংবা উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিংয়ের কারণে অসংখ্য মানুষ গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন। অথচ অনেকেই উপলব্ধি করেন না যে, রাতের ঘুম শুধু শরীরের বিশ্রামের বিষয় নয়; বরং এটি ইবাদত, মানসিক প্রশান্তি, শারীরিক সুস্থতা এবং জীবনের বরকতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

ফজরের নামাজে সময়মতো উঠতে পারা, তাহাজ্জুদের সৌভাগ্য অর্জন করা, দিনের শুরুতে সতেজ অনুভব করা, মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা ধরে রাখা— এসবের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে রাতের ঘুম। ইসলাম ঘুমকে কখনো তুচ্ছ বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং আল্লাহ তাআলা কুরআনে রাত ও ঘুম সম্পর্কে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন, যা প্রমাণ করে এটি মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত।

রাতের ঘুম: আল্লাহর দেওয়া বিশেষ নেয়ামত

আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিশ্রাম ও পুনরুজ্জীবনের জন্য রাতকে নির্ধারণ করেছেন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—

وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا ۝ وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ لِبَاسًا

‘আর আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি বিশ্রামের জন্য, এবং রাতকে করেছি আচ্ছাদনস্বরূপ।’ (সুরা আন-নাবা: আয়াত ৯-১০)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন—

هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَالنَّهَارَ مُبْصِرًا

‘তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদের জন্য রাতকে করেছেন বিশ্রামের সময় এবং দিনকে করেছেন কর্ম ও চলাফেরার উপযোগী।’ (সুরা ইউনুস: আয়াত ৬৭)

এই আয়াতগুলো আমাদের শেখায় যে, রাত মূলত আরাম, প্রশান্তি ও বিশ্রামের জন্য; আর দিন কর্ম ও দায়িত্ব পালনের জন্য।

ফজরের সঙ্গে রাতের ঘুমের গভীর সম্পর্ক

অনেক মানুষ অভিযোগ করেন যে তারা ফজরের নামাজে উঠতে পারেন না। কিন্তু খুব কম মানুষই প্রশ্ন করেন— আমি রাতে কখন ঘুমাতে গিয়েছি?

বাস্তবতা হলো— গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা ফজর মিস হওয়ার অন্যতম কারণ। সময়মতো ঘুমানো শুধু একটি স্বাস্থ্যগত অভ্যাস নয়; বরং এটি ফজরের নামাজ সংরক্ষণেরও একটি মাধ্যম।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এশার নামাজের পর অপ্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা অপছন্দ করতেন। হাদিসে পাকে এসেছে—

হজরত আবু বারযা (রা.) বর্ণনা করেন—

وَكَانَ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَهَا وَالْحَدِيثَ بَعْدَهَا

‘তিনি (রাসুলুল্লাহ সা.) এশার আগে ঘুমানো এবং এশার পর অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা অপছন্দ করতেন।’ (বুখারি ৫৬৮, মুসলিম ৬৪৭)

এ হাদিসে রাতকে উদ্দেশ্যহীনভাবে দীর্ঘায়িত না করার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।

ভোরের সময়: বরকতের স্বর্ণালী মুহূর্ত

ফজরের পরের সময়কে ইসলাম অত্যন্ত বরকতময় সময় হিসেবে বিবেচনা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করেছেন—

اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা বারিক লিউম্মাতি ফি বুকুরিহা।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য দিনের শুরুর সময়ে বরকত দান করুন।’ (আবু দাউদ ২৬০৬, তিরমিজি ১২১২)

যারা রাত জাগার কারণে সকালে ঘুমিয়ে থাকেন, তারা অনেক সময় এই বিশেষ বরকতপূর্ণ সময় থেকে বঞ্চিত হন।

ঘুম: শরীর ও মনের পুনর্গঠনের সময়

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও আজ স্বীকার করে যে, রাতের ঘুম মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। ঘুমের সময় শরীর নিজেকে পুনর্গঠন করে, মস্তিষ্ক দিনের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিশ্রাম পায়। দিনের বেলা কয়েক ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুমালেও তা রাতের স্বাভাবিক ঘুমের বিকল্প হতে পারে না। রাতের নির্দিষ্ট সময়ের ঘুম শরীরকে এমনভাবে পুনরুজ্জীবিত করে, যা অন্য সময়ে সম্ভব নয়।

ফলস্বরূপ পর্যাপ্ত রাতের ঘুম মানুষকে দেয়—

> অধিক মনোযোগ

> মানসিক প্রশান্তি

> ইবাদতে একাগ্রতা

> শারীরিক শক্তি

> কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি

> মাথাব্যথা ও চোখের ক্লান্তি থেকে সুরক্ষা

রাত জাগা: অদৃশ্য ক্ষতির কারণ

বর্তমান সময়ে রাত জাগার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একটি ভিডিও, একটি পোস্ট কিংবা কয়েক মিনিটের স্ক্রলিং কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করে দেয়, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। ফলে—

> ফজরের নামাজে ব্যাঘাত ঘটে।

> তাহাজ্জুদের সুযোগ নষ্ট হয়।

> ঘুমের মান কমে যায়।

> সারাদিন ক্লান্তি অনুভূত হয়।

> ইবাদতে মনোযোগ কমে যায়।

> মানসিক চাপ ও বিরক্তি বৃদ্ধি পায়।

তাই একজন মুমিনের উচিত এমন অভ্যাস থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে সংশোধন করা, যা তাকে আল্লাহর স্মরণ এবং বরকতপূর্ণ জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

ঘুমও হতে পারে ইবাদত

ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, ফজরে উঠার জন্য, সুস্থ শরীর নিয়ে ইবাদত করার জন্য সময়মতো ঘুমাতে যায়, তবে তার এই বিশ্রামও ইবাদতের অংশ হয়ে যেতে পারে। হজরত মু'আয ইবনে জাবাল (রা.) বলেন—

أَحْتَسِبُ نَوْمَتِي كَمَا أَحْتَسِبُ قَوْمَتِي

‘আমি যেমন আমার ইবাদতের সওয়াবের আশা করি, তেমনি আমার ঘুমের মাধ্যমেও সওয়াবের আশা করি।’ (বুখারি ৪৩৪৫)

এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক নিয়তে নেওয়া বিশ্রামও একজন মুমিনের জন্য কল্যাণকর আমল হতে পারে।

রাতের ঘুম কোনো সাধারণ অভ্যাস নয়; এটি আল্লাহর দেওয়া এক মহামূল্যবান নেয়ামত। এই ঘুমের ওপর নির্ভর করে আমাদের ফজরের নামাজ, তাহাজ্জুদের সৌভাগ্য, দিনের কর্মক্ষমতা, মানসিক প্রশান্তি এবং জীবনের বহু বরকত।

তাই প্রয়োজন রাতকে রাতের মতো ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনীয় রাত জাগা কমানো এবং ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন ও অনর্থক ব্যস্ততা থেকে নিজেকে দূরে রাখা। কারণ যে ব্যক্তি রাতের বিশ্রামকে সম্মান করে, সে দিনের বরকত লাভ করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক নিয়মের সঙ্গে নিজেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে, তার জীবনেও ধীরে ধীরে ফিরে আসে প্রশান্তি, সুস্থতা এবং অগণিত বারাকাহ।

হয়তো আমাদের জীবনের অনেক অস্থিরতা, ক্লান্তি ও ইবাদতের দুর্বলতার সমাধান লুকিয়ে আছে একটি সহজ অভ্যাসে—সময়মতো ঘুমিয়ে পড়ায়।









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]