
সংগৃহীত ছবি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) শাম্মি আহম্মেদের বাসায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং ১০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগে আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। আগামী ১০ নভেম্বর মামলাটির শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আদালত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সম্প্রতি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) ফিরোজ আহমেদ মুন্সী আদালতে এ চার্জশিট দাখিল করেন।
অন্য আসামিরা হলেন জানে আলম অপু, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন এবং এক শিশু। মামলার ছয় আসামিই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও জানে আলম অপু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
২০২৫ সালের ২৭ জুলাই গুলশান থানায় মামলাটি করেন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শাম্মি আহম্মেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফর (৭৫)।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, গুলশান-২-এর ৮৩ নম্বর সড়কে বাদীর বাসায় তাঁর স্ত্রী শাম্মি আহম্মেদকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে পুলিশের সঙ্গে অভিযানে যান আসামিরা। তাঁকে বাসায় না পেয়ে পুলিশ চলে যায়। পরে আসামিরা আবার ওই বাসায় গিয়ে শাম্মির স্বামীকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখান। এ সময় তাঁরা ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং ১০ লাখ টাকা আদায় করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৬ জুলাই বিকেলে বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে আসামিদের কয়েকজন ওই বাসায় যান। বিষয়টি বুঝতে পেরে বাদী গুলশান থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আবদুর রাজ্জাক, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব, ইব্রাহিম হোসেন ও কিশোর আমিনুল ইসলামকে আটক করে। পরে জানে আলম অপুকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসামিরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সক্রিয় কর্মী পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজিতে জড়িত হন। এ পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে তাঁরা নিয়মিত থানায় যাতায়াত করতেন। আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে পুলিশকে তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন।
পরে পুলিশের অগোচরে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগের দোসর, সহযোগী বা সমর্থক আখ্যা দিয়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি ও আদায় করতেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ চাঁদার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি নিজেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দেন। বিভিন্ন সময়ে ‘ফ্যাসিবাদী লোকজনকে’ গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন বলেও জবানবন্দিতে দাবি করেন তিনি।
রিয়াদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই রাতে শাম্মি আহম্মেদ গুলশানের বাসায় অবস্থান করছেন এমন খবর পেয়ে তাঁরা থানায় যান। পরে পুলিশের একটি দল তাঁদের সঙ্গে নিয়ে ওই বাসায় অভিযান চালায়। তবে সেখানে শাম্মিকে পাওয়া যায়নি।
রিয়াদ জানান, বাসা থেকে ফেরার সময় জানে আলম অপু একটি ইয়ারপড নিয়ে আসেন, যাতে ‘শাম্মি ইয়ারপড’ লেখা ছিল। সেটি ফেরত দেওয়ার কথা বলে তাঁরা পরে আবার ওই বাসায় যান। এ সময় অপু পানি পান করার অজুহাতে বাসার ভেতরে প্রবেশ করেন।
জবানবন্দিতে রিয়াদ আরও বলেন, তাঁরা বাদীকে জানান, তাঁর স্ত্রী বাসায় আছেন বলে তাঁরা বুঝতে পারছেন এবং তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এ পরিস্থিতিতে বাদী টাকা দিতে রাজি হলে প্রথমে ৫০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে বাদী ১০ লাখ টাকা দিতে চাইলে তাঁরা তাতে সম্মতি দেন। সেই টাকা নিয়ে তাঁরা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগ করে নেন।
বাকি ৪০ লাখ টাকা আদায়ের বিষয়ে রিয়াদ বলেন, ২৬ জুলাই বিকেল ৫টার দিকে তিনি ইব্রাহিম হোসেন, সাকাদাউন সিয়াম ও সাদমান সাদাবকে ওই বাসায় পাঠান। তাঁর দাবি, পুলিশ তাঁকে ফাঁদে ফেলার উদ্দেশ্যে বাসায় যেতে বলে। তখন তিনি গোলচত্বরে অবস্থান করছিলেন। পুলিশের কথায় ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর বাদী থানায় খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁদের আটক করে।
জবানবন্দির শেষ দিকে রিয়াদ বলেন, ‘আমি গরিবের ছেলে। আমি টাকার লোভ সামলাতে পারিনি। আমি ক্ষমা চাই।’