
ফ্যাসিবাদী শাসন, নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ও নিষিদ্ধ হওয়া সাবেক স্বৈরাচারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মীরা নোয়াখালীর মাইজদীতে আবারও বেপারোয়া হয়ে উঠেছে।
জেলা সদরের মাইজদী এলাকার নিরাময় হাসপাতালের বিপরীতে ও কানু কাজী মসজিদ এলাকায় ঘাপটি মেরে থাকা একটি চক্র এখন এলাকায় প্রকাশ্য চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও নানামুখী সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসনের এক রহস্যজনক নীরবতার কারণে সাধারণ মানুষের বৈধ কাজ, বাড়ি নির্মাণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, কানু কাজী মসজিদ ও নিরাময় হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় কেউ বাড়ি নির্মাণ বা কোনো সংস্কার কাজ করতে গেলে এই চক্রটি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাধা দিচ্ছে। রাস্তা আটকে রড, সিমেন্ট, ইট, বালু বা মাটিবাহী ট্রাক থামিয়ে মোটা অঙ্কের অবৈধ টাকা দাবি করা হচ্ছে। দাবি করা চাঁদা না দিলে নির্মাণসামগ্রী ও যানবাহন আটকে রেখে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে এই নাশকতামূলক ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেটের ৫ জন মূল হোতার নাম ও তাদের তৎপরতার চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। সাইফুল ইসলাম ফয়সাল (পিতা: নূর আলম) গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ফ্রন্টলাইন কর্মী হিসেবে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। সদর উপজেলার নাপিতের পোল এলাকায় "সাত রঙ অ্যাড" নামে তার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে থেকেই তিনি কৌশল বদলে বিরোধী দলের ছদ্মবেশ ধারণ করেন এবং সরকারবিরোধী অপতৎপরতায় বড় অঙ্কের তহবিল জোগান দেন। বর্তমানে তার এই দোকানটি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গোপন বৈঠক ও বর্তমান সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রধান আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, মনির হোসেন (পিতা: বেলায়েত হোসেন) নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান অর্থদাতা ও পরিকল্পনাকারী। তার মালিকানাধীন "ফ্যাশন ফার্নিচার" নামক দোকানে নিয়মিত বসে নাশকতার ছক আঁকা হয়। পুরো এলাকায় চাঁদাবাজির টাকা বণ্টনের হিসাব-নিকাশও এই দোকান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। এ.কে.এম. হোসাইন (কাশেম কমিশনার, পিতা: মোহাম্মাদ আলী আকবর) মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দখলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক আওয়ামী আমলের এই কমিশনার। এলাকায় নারী নির্যাতন, জোরপূর্বক মানুষের জমি দখল এবং ক্ষমতার দাপটে কাজ বন্ধ করে টাকা আদায়ের বহু পুরোনো অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মোস্তাফিজুর রহমান ভুট্টো (পিতা: কাশেম কমিশনার) জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় নোয়াখালীতে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে হামলা চালানো এবং হত্যাচেষ্টা মামলার অন্যতম পলাতক আসামি। বিপ্লবের পর এলাকা ছেড়ে পালালেও, সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর স্থানীয় কতিপয় নেতার সাথে গোপন আঁতাত ও ব্যাক-আপ নিয়ে সে আবারও এলাকায় ফিরে এসেছে। তার বিরুদ্ধে থানায় সুনির্দিষ্ট মামলা থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করছে না, যার ফলে সে বুক ফুলিয়ে এলাকায় ভাঙচুর, চাঁদাবাজি ও নানামুখী ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
লোকিয়ত উল্লাহ বাচ্ছু (পিতা: আব্দুল খালেক) তার ছেলে নোয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। বিগত আওয়ামী আমলজুড়ে ছেলের ক্ষমতার দাপটে বাচ্ছু এলাকায় বহু সন্ত্রাসী ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছেন। বর্তমানে মাইজদী এলাকায় আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন, নাশকতা ছড়ানো এবং তহবিল জোগানের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি এই বাচ্চু।
স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা। প্রকাশ্যে সড়ক আটকে চাঁদাবাজি ও নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি নিলেও পুলিশ 'নির্বিকার' ভূমিকা পালন করছে। সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা স্থানীয় থানায় বারবার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ জানালেও পুলিশ কেবল "তদন্তের আশ্বাস" দিয়েই দায় সারছে, কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
এদিকে এলাকাবাসীর আকুল আবেদন,অবিলম্বে এই ৫ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীসহ কানু কাজী মসজিদ এলাকার পুরো আওয়ামী সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনা হোক। অন্যথায় নোয়াখালীর সদর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।