শুক্রবার ১৯ জুন ২০২৬ ৫ আষাঢ় ১৪৩৩

শিরোনাম: বিএনপির বড় বিশৃঙ্খলার চেষ্টা আ.লীগের সতর্কতায় বিফল: তথ্যমন্ত্রী   সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে কাজ করছে সরকার: কাদের   নাটোরে ট্রেনে কাটা পড়ে ৩ জনের মৃত্যু   ‘কিছুই করি নাই শ্রেণিটা’ চোখ থাকতেও দেখে না: প্রধানমন্ত্রী   রাজকে আমার জীবন থেকে ছুটি দিয়ে দিলাম: পরীমনি   সৌদি আরবের ক্লাবে যোগ দিলেন রোনালদো   বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী   
ময়মনসিংহের আলেকজান্ডার ক্যাসেল ইতিহাসের সাক্ষী
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২১ মার্চ, ২০২২, ৭:৪৪ পিএম   (ভিজিট : ৭১০)

আধো আলো আধো অন্ধকারে ঘেরা আলেকজান্ডার  ক্যাসেলটি এখন শুধুই স্মৃতি। ময়মনসিংহ শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত বহু জাঁকজমক আর আভিজাত্যের সাক্ষী এই আলেকজান্ডার ক্যাসেল হারিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় বিলীনের পথে। শত বছরে বেড়ে ওঠা  স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী এই ক্যাসেল।

 ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়,ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর তৃতীয় প্রজন্ম রঘুনন্দন আচার্য চৌধুরী নিঃসন্তান ছিলেন। সম্পত্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তখনকার রেওয়াজ অনুযায়ী পুত্রসন্তানের ভীষণ দরকার ছিল তার। জমিদারি দেখাশুনার জন্য গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীকে দত্তক নেন রঘুনন্দন। মৃত্যুর আগে সেই পুত্রের হাতেই জমিদারি অর্পণ করেন। গৌরীকান্তও সন্তানহীন অবস্থায় মারা যান। গৌরীকান্তের বিধবা স্ত্রী বিমলা দেবী দত্তক নেন কাশীকান্তকে।রোগে ভুগে সন্তানহীন অবস্থায় পরলোকগমন করেন কাশীকান্ত। তার স্ত্রী লক্ষ্মী দেবী আচার্য চৌধুরানী পূর্বসূরীদের পথ অনুসরণ করে দত্তক নেন চন্দ্রকান্ত আচার্য চৌধুরীকে।তিনিও দ্রত ত্যাগ করেন পৃথিবীর মায়া। হাল ছাড়েননি লক্ষ্মী। দত্তক নেন আবার। দ্বিতীয় দত্তক পুত্রের পূর্বনাম পূর্ণচন্দ্র মজুমদার। কুলগুরুর সামনে মহাসমারোহে লক্ষ্মী দেবী নতুন নাম রাখলেন সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী।

সূর্যকান্তর শাসনামলে ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী জনপদে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। প্রায় ৪১ বছর জমিদারিতে বহু জনহিতকর কাজ করেন তিনি। ময়মনসিংহে স্থাপন করেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা।১৮৭৯ সালে বাগানবাড়ি হিসেবে ময়মনসিংহ শহরে ৯ একর ভূমির মাঝে নির্মাণ করা হয় দ্বিতল লোহারকুঠি । পরে তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নামে এর নাম রাখা হয় আলেকজান্ডার ক্যাসল। ক্যাসেলটিকে ঘিরে ছিল সুসজ্জিত একটি বাগান। যেখানে ছিলো দুর্লভ সব গাছ, লতাগুল্ম, নানান জাতের পশু-পাখি, সরীসৃপ পালনের ঘর আর জল-ফোয়ারা। বাকি সব সময়ের সাথে হারিয়ে গেলেও অতীতের জৌলুস চিহ্ন বহন করা ফোয়ারা দুটি এখনো চোখে পড়ে বাগানের সীমানার ভেতরেই। সূর্যকান্ত আচার্য নির্মিত এই ক্যাসেলের জন্যে খনন করা হয়েছিলো দীর্ঘ কৃত্রিম হ্রদ বা লেক। সময়ের প্রভাবে সেই হ্রদ যদিও এখন কচুরিপানায় ঢাকা ছোট জলাশয় বলে ভুল হয়, তবে ইতিহাস অনুযায়ী এখানেই ছিলো নয়নাভিরাম কৃত্রিম জলাশয়। ক্যাসেলের চারপাশে  বেশ কিছু নারী মূর্তি ছিলো বলে শোনা যায়, কিন্তু কালের ছোবলে সেগুলো কোথায় হারিয়ে গিয়েছে তা জানা সম্ভব হয়নি।

জনশ্রুতি রয়েছে , ভারতের সে সময়কার ইংরেজ সেনাপতি জর্জ হোয়াইট, ভারতের বড় লাট লর্ড কার্জন, ফ্রান্সিস ম্যালকম, রাশিয়ার যুবরাজ ডিউক মরিস, আয়ারল্যান্ডের লর্ড উইসবোর্ন, স্পেনের ডিউক অব পেনাবেন্ডা, মিশরের যুবরাজ ইউসুফ কামাল পাশা, শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী ভ্রাতৃদ্বয়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, স্যার সলিমুল্লাহ সহ অনেকে আলেকজান্ডার ক্যাসেলে এসেছিলেন।

লোহা, কাঠ ও টিন দিয়ে এই কুঠি নির্মাণে প্রাকৃতিকভাব শীতল রাখতে সিলিংয়ে ব্যবহার করা হয় ফ্রান্স থেকে আনা আব জাতীয় দুর্লভ এক বস্তু। তখন ভবনটির চারপাশে ছিল দিঘি ও বাগান। আলেকজান্ডার ক্যাসেল মূলত মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্যের অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সে সময় বহু বিখ্যাত ব্যক্তি এখানে সময় কাটিতে এসেছিলেন। ১৯২৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে এসে চারদিন কাটিয়ে গিয়েছিলেন।

তথ্য অনুযায়ী  দেশ ভাগের পর ১৯৪৮ সালে আলেকজান্ডার ক্যাসেলকে ঘিরে নির্মিত হয় টিচার্স ট্রেনিং কলেজ এবং প্রথমদিকে প্রাসাদ ভবনটিকেই ক্লাস নেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো। পরবর্তীতে কলেজের জন্য আরো ভবন নির্মিত হলে পর্যায়ক্রমে একে শিক্ষকদের থাকার স্থান এবং সর্বশেষ কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

সূত্রানুসারে  প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ২০১৯ সালে আলেকজান্ডার ক্যাসেলটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বুঝে নেয়ার কাজ এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জান যায়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এ ব্যাপারে দায়িত্ব নিলেও  ঐতিহ্যপূর্ণ এ ক্যাসেলটি  এখনো যত্বের ছোয়া লাগেনি।। এসব সত্ত্বেও অনেক কিছু জানার ও দেখার আগ্রহ নিয়ে অনেক পর্যটককে এখানে আসতে দেথা যায়।
 
স্থানীয় কথাসাহিত্যিক  নটরডেম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আতিকুল বাশার বলেন, ময়মনসিংহ নগরীর  ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত। ইকোটোরিজম ও হিস্টোটোরিজম এর অভয়ারণ্য ময়মনসিংহ নগরীকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে দেয়ার আগেই প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে আগে সংস্কার করতে হবে। ব্রিটিশ আমলে ১৯২৬ সালে এই বাগানবাড়িতে এসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে এসেছেন রাশিয়ার যুবরাজ, লর্ড কার্জন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহসহ অনেক গুণী।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এই লোহারকুঠিরের বর্তমান দুরাবস্থায় হতাশ এই কথাসাহিত্যিক। তিনি জানান, এক সময়কার দৃষ্টিনন্দন আলেকজান্ডার ক্যাসেলের লোহা ও কাঠ ভেঙে পড়ছে, খসে পড়ছে পলেস্তারা। সামনে থাকা নারীর ভাস্কর্যটি এখনও কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত এর সৌন্দর্য ধরে রাখতে এখনই উদ্যোগ নেওয়ার দাবি করেছেন এই সাহিত্যিক।

রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়ে স্থানীয়রা  বলেন, এই ক্যাসেলটি  তো ইতিহাসের ঐতিহ্য স্মৃতি বহন করে।  প্রজন্মকে শিক্ষা দেয় তার অতীত ইতিহাসে কারা ছিল, তারই একটি প্রতিছবি। তা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে, পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকার ও প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরকে নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।  আলেকজান্ডার ক্যাসেলের সামনে  এলে অনেক স্মৃতি ভেসে ওঠে। এটিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

ময়মনসিংহের পরিবেশবাদী অ্যাডভোকেট শিব্বির আহমেদ লিটন জানান, প্রতœতত্ত্ব বিভাগে একাধিকবার আবেদন করা হলেও তারা কর্ণপাত করেনি। এটা তাদের একটা বড় ব্যার্থতা। কি কারনে তারা ব্যার্থ এ ব্যাপারটি খতিয়ে দেখা দরকার। আলেকজান্ডার ক্যাসেলটির দৃষ্টিনন্দন সংস্কার করে লেকটি খনন করলে এটি ময়মনসিংহের একটি পর্যটনকেন্দ্র হতে পারতো।  এখন পর্যন্ত এটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি  কর্তৃপক্ষ।

প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর ঢাকা বিভাগীয় কায্যালয়ের উপ-পরিচালক গোলাম ফেরদৈস জানান, আলেকজান্ডার ক্যাসেলটির ডকুমেন্টেশনের কাজ শেষ হয়েছে, এখন কনজারভেশনের জন্য প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আলেকজান্ডার ক্যাসেলের জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে আয়রন স্ট্রাকচার মেরামত করা হবে। এটা অনেক ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমাদের পরিকল্পনা আছে এই স্থাপনাকে জাদুঘর এবং প্রতœতাত্ত্বিক স্থান বানানোর। এই ক্যাসেলে যে মূর্তিগুলো আছে সেগুলো সংরক্ষণের জন্য মার্কিন কোম্পানির সাথে যোগাযোগ চলছে। তাছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগ নিয়ে আমাদের আরো অনেক বৃহৎ পরিকল্পনা রয়েছে। ২০১৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে আলেকজান্ডার ক্যাসেলটিকে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই পুরাকীর্তিটি ব্যাতিক্রম ধরনের।









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]