
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কয়েক’শ ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম এখন আর শুধু জুলাই আন্দোলনের ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা (ক্রসফায়ার), গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনের অভিযোগ এবং ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মামলার সংখ্যা ও আসামির পরিধি বাড়ছে।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ছয়টি মামলার রায়ে ৬১ জনকে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বর্তমানে ৭০টির বেশি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে গুম, হত্যা ও কথিত ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি অভিযোগ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত করছে তদন্ত সংস্থা।
বাড়ছে মামলার পরিধি
জুলাই আন্দোলনের মামলার বাইরেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নতুন নতুন মামলা ট্রাইব্যুনালে আসছে।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “জুলাইকে কেন্দ্র করে হতাহতের সব ঘটনায় হওয়া মামলাগুলো ট্রাইব্যুনালে পাঠাতে বলেছি। তবে এর বাইরেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আরও বেশ কয়েকটি মামলা আসছে।”
জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের ঘটনাগুলোকে একটি বা দুটি কেন্দ্রীয় মামলায় সীমাবদ্ধ না রেখে ঘটনাস্থল, হতাহত, সংশ্লিষ্ট বাহিনী ও অভিযুক্তদের দায়িত্ব অনুযায়ী পৃথক মামলা হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে। ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, নরসিংদী ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকাকে পৃথক ‘ক্রাইম সিন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া গণশুনানি ও ভুক্তভোগী পরিবারের কাছ থেকে নতুন তথ্য পাওয়ায় আগে নথিভুক্ত না হওয়া মৃত্যু, আহত, নিখোঁজ ও নির্যাতনের ঘটনাও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।
গত ২ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ওই এলাকায় জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু ৫ আগস্টই সেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ জন নিহত হওয়ার প্রাথমিক তথ্য রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৮৫ বলে উল্লেখ করা হলেও চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত এটিকে প্রাথমিক হিসাব হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
জুলাইয়ের বাইরেও তদন্ত
মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত এখন ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বাইরের ঘটনাতেও বিস্তৃত হয়েছে।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার গুম, কথিত ‘আয়নাঘর’, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ঘটনাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো সুসংগঠিত বা পদ্ধতিগত নীতির অংশ ছিল কিনা, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
তদন্তে শুধু ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের নয়, নির্দেশদাতা, পরিকল্পনাকারী, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারী এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কমান্ড পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং অন্যান্য সংস্থার সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নামও আসামির তালিকায় যুক্ত হচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “গুম ও ক্রসফায়ারের সব ঘটনাই তদন্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদন এসেছে। টেকনাফের কাউন্সিলর একরাম হত্যা এবং শাপলা চত্বরের ঘটনায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও ১২টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে পর্যায়ক্রমে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে।”
সামনে আরও মামলা
বর্তমান তদন্তের অগ্রগতি অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালে মামলার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, নরসিংদী ও রাজশাহীর মতো বেশি হতাহতের এলাকাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন, গুম ও কথিত ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত তদন্ত এবং বিভিন্ন জেলার গণশুনানি থেকে নতুন অভিযোগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
চলছে নতুন গ্রেফতার
শাপলা চত্বরের ঘটনায় মামলায় জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে গত ২৯ জুলাই রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া ৩ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চারজনকে ট্রাইব্যুনাল-২ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখান।
তারা হলেন, ঢাকা-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ওসি আবুল হাসান, যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ মুন্না এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম খান। তারা আগে থেকেই অন্য মামলায় কারাগারে ছিলেন।
‘দ্রুত বিচার, কিন্তু তাড়াহুড়া নয়’
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “মামলার সংখ্যা বাড়লেও তাড়াহুড়া করে বিচার শেষ করা হবে না। দ্রুত বিচার করতে গিয়ে যেন অবিচার না হয়, আবার অযথা বিলম্বেও যেন ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন সে ভারসাম্য রেখেই কাজ করছি।”
তিনি জানান, প্রতিটি মামলায় সাক্ষ্য, ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের পরই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আদালতে দাখিল করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “দায়িত্ব নেওয়ার পর পাঁচ থেকে ছয়টি মামলা পুনঃতদন্তে পাঠানো হয়েছে। কোনও নিরীহ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং কোনও প্রকৃত অপরাধী যেন রেহাই না পান এই নীতি অনুসরণ করেই তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই করা হচ্ছে।”
তিনি জানান, মামলার বর্তমান প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।