
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে চলা তীব্র ছাত্র আন্দোলন এবং নিট-ইউজি প্রশ্ন ফাঁস ও পরীক্ষার অনিয়ম বিতর্কের মুখে অবশেষে পদত্যাগ বাধ্য হয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
ওড়িশার সাম্বলপুরের এই বিশিষ্ট বিজেপি নেতা ২০২১ সাল থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরও তাকে একই পদে বহাল রাখে নরেন্দ্র মোদি সরকার। তবে প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা ব্যক্তিগত অদক্ষতার কারণে নয়, বরং জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করা এবং সরকারের ওপর জনআস্থা পুনরুদ্ধার করার এক অনিবার্য রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই তার এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
চলতি বছরের ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই মূলত সংকটের সূত্রপাত হয়। পরীক্ষার কিছুদিন আগে পরীক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়া একটি ‘গেজ পেপার’-এর সঙ্গে মূল পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের বহু মিল খুঁজে পান তদন্তকারীরা।
এর প্রেক্ষিতে গত ১২ মে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) পরীক্ষাটি বাতিল করে এবং পুরো বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন-এর হাতে ন্যস্ত করে। কিন্তু পরীক্ষার দুর্নীতি রোধে সিবিআই তদন্ত, অভিযুক্তদের গ্রেফতার এবং দ্রুত নতুন পরীক্ষা নেওয়ার মতো সমস্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও আন্দোলন থামানো যায়নি। ক্ষোভ কেবল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা রাজপথ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র আকার ধারণ করে।
দলের ভেতরের সিনিয়র নেতারা স্বীকার করেছেন যে পরিস্থিতি এমন এক মোড় নিয়েছিল যেখানে ক্ষুব্ধ তরুণ সমাজ আর সরকারের কথা শুনতে প্রস্তুত ছিল না। বিশেষ করে বর্তমান সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এই সংকট যদি দীর্ঘায়িত হতো, তবে তা পুরো সংসদীয় এজেন্ডাকে পণ্ড করে দিতে পারত।
বিজেপির নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল এই যে এই পরীক্ষায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া তরুণ ও পরিবারগুলো মূলত তাদেরই মূল ভোটার ভিত্তি। উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই যুবসমাজ যদি ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে, তবে তার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিণতি হতে পারে। তাছাড়া, বিরোধী দলগুলোর আক্রমণ এবং নেতিবাচক রাজনৈতিক বয়ান হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেও নেতৃত্ব কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
এর আগে জানুয়ারিতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমতা প্রচার সংক্রান্ত প্রবিধান প্রত্যাহার এবং মে মাসে সিবিএসই দ্বাদশ শ্রেণির খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ত্রুটির মতো কিছু ঘটনা সরকারের জন্য আগে থেকেই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি ২০২৪ সালের নিট ফলাফলের সময়ও ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল।
তবে দলীয় সূত্রগুলো জোর দিয়ে বলছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই পদত্যাগকে তার সামগ্রিক পারফরম্যান্স বা জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে তার সফল ভূমিকার ব্যর্থতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। ওড়িশার প্রভাবশালী ওবিসি নেতা হিসেবে তিনি সবসময়ই দলের অন্যতম প্রধান সংস্কারক হিসেবে কাজ করেছেন।
কিন্তু সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল তরুণ প্রজন্মের সাথে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এড়ানো এবং সরকারের মূল এজেন্ডাকে অক্ষুণ্ণ রাখা। শেষ পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান জনরোষ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে নতি স্বীকার করেই বিজেপি নেতৃত্বকে এই কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।