রবিবার ২৬ জুলাই ২০২৬ ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩

শিরোনাম: জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি   ভারতের নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশী সম্পর্কে যা জানা গেল   যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে কোনো চুক্তি করবে না ইরান   শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর ভারতে সরকার পতনের ডাক   শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের পাশে আগুন   সাংগঠনিক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান   ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৪৩৯   
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘চায়না দুয়ারি’র দাপটে বিলুপ্তির পথে দেশীয় মাছ
নিষিদ্ধ ফাঁদে ধ্বংস হচ্ছে পোনা ও মা মাছ, সংকুচিত হচ্ছে প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র, হুমকিতে নদী-খাল-বিলের জীববৈচিত্র্য
মোঃ সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৩:৫০ পিএম   (ভিজিট : ৪৫)

একসময়ের পদ্মা, মহানন্দা, পুনর্ভবা ও পাগলা নদীসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের অসংখ্য খাল-বিল দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্ষা এলেই নদী ও বিলে দেখা মিলত শৈল, গোটি আইড়, পুঁটি, রুই, কাতলা, চিংড়ি, বোয়াল, মাগুর, কৈ, শিং, গজার, বাইলা, ভেদা, খোলসা, টেংরা, ঘেড়া, খরি, কাকিলাসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছের। কিন্তু প্রাকৃতিক জলাশয় সংকোচন, নদী ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং সর্বোপরি নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ ফাঁদের অবাধ ব্যবহারে সেই চিরচেনা দেশীয় মাছ আজ বিলুপ্তির পথে। মাছ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জেলার প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ সংকটে পড়বে।

জানা গেছে বর্ষা মৌসুম দেশীয় মাছের প্রজননের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে নদী, খাল, বিল ও প্লাবনভূমিতে মাছ ডিম ছাড়ে এবং নতুন পোনা বেড়ে ওঠে। কিন্তু পানির প্রবাহের মুখে বসানো সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ ফাঁদে পোনা মাছ, ডিমওয়ালা মা মাছ এমনকি বিভিন্ন জলজ প্রাণীও নির্বিচারে ধরা পড়ছে। এতে মাছ বড় হওয়ার আগেই নিধন হচ্ছে এবং স্বাভাবিক প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সরেজমিনে সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলার বিভিন্ন নদী, খাল ও বিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁশ, প্লাস্টিক ও সূক্ষ্ম জালের সমন্বয়ে তৈরি শত শত চায়না দুয়ারি পানির প্রবাহের মুখে স্থাপন করা হয়েছে। এসব ফাঁদে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ আটকা পড়ছে। শুধু মাছ নয়, কাঁকড়া, কুচিয়া, শামুক, ঝিনুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীও ধ্বংস হচ্ছে।
বর্ষার নতুন পানিতে টেংরা, পুঁটি, কৈ, শিং, মাগুর, টাকি, শোল, গজার, বোয়ালসহ দেশীয় মাছের বিচরণ বাড়লেও চায়না দুয়ারির কারণে মাছ বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়ছে। ফলে প্রতি বছরই প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত দেশীয় মাছের সংখ্যা কমছে।

শিবগঞ্জ উপজেলার  জেলে আব্দুর রাজ্জাক   বলেন, চায়না দুয়ারির জালের ফাঁস এত ছোট যে পোনা মাছও বের হতে পারে না। মা মাছ, ডিম, পোনা, সব একসঙ্গে ধরা পড়ে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় মাছ পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

পরিবেশকর্মী মনিরুজ্জান মনির বলেন একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের নদী-খাল-বিলে দেশীয় মাছের যে বৈচিত্র্য ছিল, তা এখন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। অবৈধ জাল, নদী ভরাট, জলদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাকৃতিক জলাশয় সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে চায়না দুয়ারির নির্বিচার ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ নদী, বিল ও জলাভূমি সমৃদ্ধ একটি জেলা। পদ্মা, মহানন্দা, পুনর্ভবা ও পাগলা, এই চারটি নদীর পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় বিল ও জলাশয়। সরকারি কোনো একক তালিকা না থাকলেও উল্লেখযোগ্য বিলগুলোর মধ্যে রয়েছে রামদাস বিল (গোমস্তাপুর), বিল ভাতিয়া, আজাইপুর বিল, বিল চুড়ইল, বিল কুজাইন, বিল সিংড়া, বিল হোগলা, বিল পুটিমারি, বিল আনইল, বিল মরিচাদহ ও বিল কুমিরাদহ। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে নদীর প্লাবনে গোমস্তাপুর, শিবগঞ্জ, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় অস্থায়ী বিল ও জলাভূমির সৃষ্টি হয়, যা দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এসব জলাশয়ে প্রতি বর্ষায় টেংরা, পুঁটি, কৈ, শিং, মাগুর, শোল, গজার, বোয়াল, টাকি, চিংড়িসহ অসংখ্য দেশীয় মাছের ডিম ছাড়ার মৌসুম শুরু হয়। কিন্তু নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারির ব্যবহার এবং জলাশয় দখল-ভরাটের কারণে এসব প্রজননক্ষেত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মৎস্য চাষের উপযোগী পুকুরের সংখ্যা ১১ হাজার ৩৫০টিরও বেশি। এর মধ্যে সরকারি খাস পুকুর ও জলাশয় রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজারটি। শুধু নাচোল উপজেলাতেই সরকারি পুকুর ও জলমহালের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৬০০টি। এছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ৮ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার পুকুর রয়েছে।

পুকুর ছাড়াও জেলায় রয়েছে ৪টি নদী, প্রায় ১৩টি উল্লেখযোগ্য বিল, ৩৭টি প্লাবনভূমি এবং ১১টি খাল। এত বিপুল জলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও উন্মুক্ত জলাশয়ে দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।

স্থানীয় প্রবীণ আইনজীবী হামিদুল হক জানান, একসময় উন্মুক্ত জলাশয়ে শৈল, গোটি আইড়, গজার, কাকিলা, ভেদা, খোলসা, বাইলা, টেংরা, ঘেড়া, খরি, বোয়াল, কৈ, শিং, মাগুর, পুঁটি, রুই, কাতলা ও দেশীয় চিংড়ি সহজেই পাওয়া যেত। এখন এসব মাছ আগের মতো আর দেখা যায় না। বিশেষ করে শৈল, গোটি আইড়, গজার, কাকিলা, ভেদা, খোলসা ও বাইলা মাছ এখন অনেকটাই বিরল হয়ে পড়েছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক জলাশয় কমে যাওয়া, নদী ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং অবৈধ জাল ব্যবহারের ফলে এসব দেশীয় প্রজাতির স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২ নম্বার ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার আরমান আলী জানান জেলার বিভিন্ন  এলাকায় কৃত্রিম পুকুর, দিঘি ও আধুনিক খামারে আইপিআরএস (ইন-পন্ড রেসওয়ে সিস্টেম) এবং হ্যাচারিনির্ভর কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিদেশি ও হাইব্রিড মাছের উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে।

চাঁপাইনবাবগন্জের সদর উপজেলার জেলে  আব্দুল বাতেন জানান হাইব্রিড থাই পাঙ্গাস, আফ্রিকান বা হাইব্রিড মাগুর, থাই কৈ, হাইব্রিড শিং, হাইব্রিড পাবদা, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, কমন কার্প (মিরর কার্প), বিগহেড কার্প, ব্ল্যাক কার্প, মনোসেক্স তেলাপিয়া, গিফট বা থাই তেলাপিয়া, থাই রূপচাঁদা এবং হাইব্রিড রুই-কাতলা। দ্রুত বৃদ্ধি ও অধিক উৎপাদনের কারণে এসব মাছ বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও দেশীয় প্রজাতির অস্তিত্ব সংকুচিত হচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রকাশ্যেই চায়না দুয়ারি বিক্রি হচ্ছে। নদী ও বিলে নিয়মিত ব্যবহার হলেও কার্যকর নজরদারির অভাবে এসব নিষিদ্ধ ফাঁদের ব্যবহার কমছে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শাহীনূর রহমান বলেন, নিষিদ্ধ 'চায়না দুয়ারি' কোনো অবস্থাতেই ব্যবহার করা যাবে না। এই ফাঁদের জাল অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী আটকা পড়ে। এতে দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। বর্ষা মৌসুমে আমরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। কোথাও চায়না দুয়ারি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে জাল জব্দ করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মৎস্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করতে প্রচার-প্রচারণাও চালানো হচ্ছে।

শিবগঞ্জ সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার সরকার বলেন, পদ্মা, মহানন্দা ও স্থানীয় খাল-বিলে এখন দেশীয় মাছের প্রজননের উপযুক্ত সময়। এ সময়ে চায়না দুয়ারি ব্যবহার করলে আগামী মৌসুমে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। আমরা নিয়মিত নজরদারি করছি। জনপ্রতিনিধি, জেলে ও স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অবৈধ জাল নির্মূলে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ইমরুল কায়েস বলেন, নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ ব্যবহার শুধু আইন লঙ্ঘনের শামিল নয়, এটি দেশীয় মাছের প্রজনন ও প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদের জন্য মারাত্মক হুমকি। বর্ষা মৌসুমে মা মাছ ও পোনা সংরক্ষণে মৎস্য বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অবৈধ ফাঁদ জব্দ ও আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। আমরা সবাইকে এ ধরনের নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। কোথাও ‘চায়না দুয়ারি’ বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের তথ্য পেলে দ্রুত মৎস্য বিভাগকে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক  আবু সালেহ মোঃ মুশা জানান কয়েক দিন আগে  জেলার মিটিংয়ে মৎস্য কর্মকর্তাসহ উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের দেশীয় মাছ রক্ষার্থে কঠোর নজরদারি  ও অভিজানের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে,। তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারির ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া দেশীয় মাছের অস্তিত্ব রক্ষা সম্ভব নয়। অন্যথায় একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের নদী-খাল-বিলে দেশীয় মাছের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য কেবল স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। 










  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]