
যশোরের ঝিকরগাছায় সর্বনাশা মাদকের ভয়াবহ বিস্তার বেড়েই চলেছে। মাদকের ভয়াবহতায় উদ্বিঘ্ন অভিভাবক মহল। আদরের সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে অবাধ্য ও বিপথগামী হচ্ছে। লোক লজ্জার ভয়ে মুখ খুলতে পারেন না বাবা-মা। চুপিসারে সন্তানকে বশে আনতে বাবা-মায়ের সন্তানের কাছেই যেন অসহায় আত্মসমর্পণ! বাড়তি আবদার রক্ষা করছেন। তাতেও কাজ হচ্ছে না। এই ভালো -তো পরক্ষণেই বেপরোয়া অসদাচরণ! অতিষ্ঠ বাবা-মায়ের নিরব কান্না!
এদিকে সন্ধ্যা নামলেই ছড়িয়ে পড়ছে মাদকের বিষবাষ্প! ডজন মামলার মাদক সম্রাট- সম্রাজ্ঞী মসিদম্পতি ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
সূর্যাস্তের পর থেকে যেন মাদক বিকিকিনির হাট বসে মল্লিকপুর গুচ্ছগ্রামে! সন্ধ্যার পর কৃষ্ণনগর মাগুরা পট্টি ও বারোয়ারি পূজা মন্দিরের আশপাশ এলাকা,রেল স্টেশন এলাকা ও সুইপার পল্লীতে মাদকের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। বেচাকেনায় চলে অভিনব কৌশল। চলে হাত বদল। হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক।
নাভারণ ইউনিয়নের রঘুনাথপুর ডাংগি গ্রামের মাদক ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন (৩০)একই গ্রামের এনামুল শিকদার লিওন (৩২) সবুজ হোসেন (২৬)
ও সাকিল শিকদার (২৮) পার্শ্ববর্তী কুন্দিপুর গ্রামের জিয়াউর রহমান মাদক ব্যবসায় জড়িত।
সূত্রগুলো বলছে,ঝিকরগাছা পৌরসদর বারোয়ারি পূজা মন্দিরের সামনের একটি বহুতল ভবনে নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসে। বিত্তশালী এক আদরের দুলাল এই মাদক আড্ডার আয়োজক!
বেপরোয়া মাদকসেবন ও কারবারিদের লাগাম কোন মতেই যেনটেনে ধরা যাচ্ছেনা। বরং বেপরোয়া দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসন ও শীর্ষে জনপ্রতিনিধিদের 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণাকে যেন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলেছে মাদক কারবারিরা!
মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান চলমান। মাঝে মধ্যে ধরা পড়ছে। জেল জরিমানাও গুনছে। আদালতে চালান দিলেও জামিনে বেরিয়ে ফের জড়িয়ে পড়ছে মাদক কারবার ও সেবনে।সর্বনাশা মাদকের অশুভ বিস্তার ছড়িয়ে পড়েছে উপজেলা সদরসহ প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে। মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার যেন কোন মতেই ঠেকানো যাচ্ছেনা। মাদককারবারী পুরুষের পাশাপাশি একাধিক নারী সদস্যরাও জড়িত রয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। কৃষ্ণনগর মন্ত্রিপাড়ার মাদক সম্রাট-সম্রাজ্ঞী মসিদম্পতির বিরুদ্ধে ডজন ডজন মাদক মামলা। তারপরও মাদক কারবারে বেপরোয়া-লাগামহীন!
কারা তাদের নিয়মিত খদ্দের?
এরা মুখোশধারী ভদ্রলোক! আছে সামাজিক ও রাজনৈতিক পদ পরিচয়! ছিঃ ছিঃ লজ্জা-লজ্জা! এদিকে সর্বনাশা মাদক ইয়াবা ফেনসিডিলের পাশাপাশি হোমিও চিকিৎসার আড়ালে রেকটিফাইড স্প্রিট বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জেল-হাজতবাস হয়েছে কথিত একাধিক হোমিও চিকিৎসকের! স্বভাবের পরিবর্তন হয়নি! ফের চলছে গোপনীয়-লোভনীয় কারবার!
তথ্যাভিজ্ঞ মহল ও স্থানীয়দের অভিযোগ,মাদকসেবন শুধু নৈতিক অবক্ষয় ঘটায় না। প্রাণঘাতিয় হয়ে ওঠে। মাদকসেবন ও কারবারিদের সীমাহীন দৌরাত্ব্যে এলাকার যুবসমাজ ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের মেধাবী ছাত্র-যুবকসহ অনেকেই আসক্ত হয়ে পড়ছে ইয়াবা,ফেনসিডিল,গাঁজা ও দেশীয় মদের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর মাদকে। মাদকের বিষবাষ্পের অশুভ প্রভাবে দাম্পত্য কলহ,বিচ্ছেদসহ পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টির পাশাপাশি এলাকায় চুরি,ছিনতাই,সামাজিক অপরাধ অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।কিছুতেই যেন লাগাম টানা যাচ্ছেনা।
উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক মিটিংয়ে বারবার উঠে আসছে মাদকের ভয়াবহ এই চিত্র। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠ প্রকাশ করা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ ও সামাজিক আন্দোলনের কঠোর সিদ্ধান্তের কথা বলা হলেও কার্যত স্বস্তিদায়ক ফলাফল অর্জিত হচ্ছেনা এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
একাধিক বিশ্বস্তসূত্রে জানাগেছে,পৌরসদরের কৃষ্ণনগর মন্ত্রিপাড়ার বহুলালোচিত ফেন্সি সম্রাট মশিয়ার ওরফ মসি (৫০)কাশীনাথ বসু(৪৫) মল্লিকপুর গুচ্ছগ্রামের শিশির (৩৫) গাঁজা ব্যবসায়ী আসাদুল (৪৫),আরিফ (৩৫) ও ভুলু (৪০)ইয়াবা ব্যবসায়ী রাজ (২০) পুরন্দরপুর সাদ্দাম পাড়ার রুবেল (৪২),পাবাজার পশুহাট এলাকার জলিল(৩০),পুরন্দরপুর হঠাৎ পাড়ার ইয়াবা কারবারী শিশির (৩৮) পানিসারা ইউনিয়নের নীলকন্ঠ নগর গ্রামের ইয়াবা কারবারি ইব্রাহিম (৪৫) ঝিকরগাছা শহীদ মশিউর রহমান কলেজ রোড রেললাইন পাড়ার বাংলা ও চোলাই মদ বিক্রেতা শ্যামল(৪০) ও প্রসাদ (৪৫), হাজিরালী এলাকার শহিদ(৪০),আলাউদ্দিন(৩৫) ও শরিফুল (৫৫),কাউরিয়া চৌধূরীপাড়ায় ওলিয়ার চৌধূরী(৫৭)।পায়ড়াডাঙ্গা এলাকার বহুলালোচিত জামসেদ(৫৫),ফারাসাতপুরের রবিউল(৫৪),ঝিকরগাছা উপজেলা সীমান্তবর্তী মনিরামপুর উপজেলার কাশেমপুর বটতলায় কামাল(৫০) কাউরিয়া এলাকার আলোচিত ইয়াবা কারবারি ও সেবনকারী মানিক (৩৫)'র অকাল মৃত্যুর কারণ মাত্রাতিরিক্ত মাদক সেবন। এমনটাই বলছেন প্রতিবেশীরা। ১৭জুলাই নিজ বাড়ির বসতঘরে সে ঘুমিয়ে পড়ে। ১৮জুলাই সকালে তার পরিবারের লোকজন তাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পাই।
উপজেলার গদখালি ইউনিয়নের বারবাকপুর গ্রামের মাদককারবারি আরমান(৩৭),কামাল(৩৫), কাইয়ুম(৩৬),মামুন(৩৭),মিজানুর(৪২),আব্দুল কাদের খোকন(৪৫)। এদের মধ্যে অন্যতম আমীর আলী দফাদারের ছেলে কলমউদ্দিন ওরফে কলম (৫২)। এরা সর্বনাশা মাদক ইয়াবা,রেক্টিফাইড স্পিরিট ও গাঁজা ব্যবসার সাথে জড়িত।
জানাগেছে, সে ২০আগষ্ট ২০২৫ তারিখে ১২০বোতল রেক্টিফাইয়ড স্পিরিটসহ ঝিকরগাছা থানা পুলিশের হাতে আটক হয়। একই এলাকার জাকির হোসেন(৪৩) ১৫০বোতল রেকটিফাইড স্পিরিটসহ ২৬অক্টোবর যশোর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে আটক হয়। ওদিকে উপজেলার নিভৃতপল্লী বাঁকড়া ইউনিয়নের মুকুন্দপুর নতুন বাজারের ইয়াবা ও গাজা ব্যবসায়ী জাকির হোসেনকে অতিসম্প্রতি এলাকাবাসী মাদকসহ ধরে ফেলে। সূত্রের দাবি, সে ধরা পড়ার পর এলাকাবাসী বাঁকড়া ফাঁড়ি পুলিশকে অবহিত করে। কিন্তু, রহস্যজনক কারণে পুলিশ তাকে আটক কিংবা আইনগত কোন ব্যবস্থা নেইনি বলে অভিযোগ ওঠে। একই সূত্রে দাবি বাঁকড়া দরগা ডিঙি ঋষি পাড়ার মানিক ও সাধনঋষি দীর্ঘদিনের চিহ্নিত মাদক কারবারি।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর আজিপাড়া গ্রামের আব্দুল হামিদ (৩৫),বাঙ্গালপাড়ার সায়েম (৩৫),বিশ্বাস পাড়ার শফিকুল (৩৮) ও পার্শ্ববর্তী মাগুরা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের আলোচিত ইয়াবা ব্যবসায়ী ওলিয়ারের স্ত্রী অন্যতম। সূত্রের দাবি, পুলিশের সাথে তাদের রয়েছে গোপন লেনদেন ও সখ্য।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি মাদক কারবারি কলম ও জাকিরের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তারা পুলিশকে জানায় রেক্টিফাইয়ড স্পিরিটের চালান আসে যশোরের একমাত্র ডিলার বস্তাপট্টি চৌরাস্তা এলাকার কেন্ট হোমিও ফার্মেসি থেকে। এখান থেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলা শহর ও গ্রাম-গঞ্জের হাটবাজার এমনকি প্রত্যন্ত জনপদে পৌঁছে যাচ্ছে।
মাদক কারবারীদের সাথে সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্রের দাবি,শুধু জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই এ.কেন্ট হোমিও ফার্মেসি থেকে রেক্টিফাইড স্প্রিট ছড়িয়ে পড়ছে নড়াইল,খাজুরা,মাগুরা,বারোবাজার, কালিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায়। ক্ষতিকর রেকটিফাইড স্পিরিট বিক্রেতা ও চিহ্নিত মাদকস্পটের মাদক বিক্রেতাদের সাথে গোয়েন্দা পুলিশের কতিপয় অসাধু সদস্যের অলিখিত চুক্তি রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
অভিযোগের সত্যতা জানতে এ.কেন্ট হোমিও ফার্মেসির প্রোপ্রাইটর ডা:রবিউল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, আমি একজন হোমিও চিকিৎসক। ছোট একটি দোকান আছে আমার। রেকটিফাইড স্প্রিট বেচাকেনার সাথে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই।
যশোর গোয়েন্দা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিবি) উপ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) অলোক কুমারের সাথে তার মুঠোফোনে নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন।
ঝিকরগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ গোলাম কিবরিয়া হাসান বলেন, মাদক কারবারিদের কোন ছাড় নেই। অভিযুক্তদের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে-হচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। যাদের নাম পাওয়া যাচ্ছে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।