প্রকাশ: শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ৩:০৬ পিএম (ভিজিট : ২৯)

চোখে আলো নেই, তবুও জীবনের লক্ষ্য তার কাছে আয়নার মতো পরিষ্কার। কারো কাছে হাত না পেতে, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামের ৫৬ বছর বয়সী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মুখলেসুর রহমান। গত ৫০ বছর ধরে প্রতিদিন দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে কাঠকাটা মিলে গিয়ে গাছের ছাল ছাড়িয়ে তা বিক্রি করে বৃদ্ধা মায়ের অন্নসংস্থান করছেন তিনি।
জন্ম থেকেই সুস্থ স্বাভাবিক মুখলেস ছয় বছর বয়সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ধীরে ধীরে অন্ধত্ববরণ করেন। এরপরই শুরু হয় তার জীবনের সাথে এক কঠিন লড়াই। ঘরে তার ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা রলি বেগম ও নিজের দুবেলার খাবারের জোগাড় করতে প্রতিদিন বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে কাঠকাটা মিলে যান তিনি। কোনো সাহায্য ছাড়া কেবল হাতের স্পর্শ আর রাস্তার ধুলোবালি অনুভব করেই গত ৫০ বছর ধরে তিনি এই চেনা পথ পাড়ি দিচ্ছেন।
মিলে পৌঁছানোর পর শুরু হয় তার হাড়ভাঙা পরিশ্রম। অন্ধ চোখ নিয়ে ইট দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে গাছের শক্ত ছাল ওঠান মুখলেসুর। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে সেই কাঠ বস্তায় ভরে মাথায় তুলে নেন এবং পরিচিত পথ ধরে ফিরে আসেন মায়ের কাছে। মা রলি বেগম সেই কাঠ রোদে শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করেন। তা থেকে সামান্য যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে চলে মা-ছেলের সংসার ও চিকিৎসার খরচ।
স্থানীয়রা জানান, অত্যন্ত পরিশ্রমী ও সৎ মুখলেসুর চাইলে মানুষের দ্বারে হাত পাততে পারতেন। কিন্তু কোনো দিন কারো কাছে হাত পাতেননি তিনি, বরং মাথা উঁচু করে বাঁচতে সম্মানজনক এই কাজ বেছে নিয়েছেন মুখলেসুর রহমান। এখন তো দেখা যায় মাকে অনেকে অবহেলা করে, অনেক কর্মক্ষম মানুষ ভিক্ষা করে; সেখানে মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও সমাজে সততার এক উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করেছেন মুখলেসুর।
নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই সংসারে এক ভাই সুস্থ সবল হলেও হতদরিদ্র হওয়ায় সেও সাহায্য করতে পারে না। আর তাই কষ্ট যেন বৃদ্ধা মা ও ছেলের নিত্যদিনের সঙ্গী। স্থানীয় মিল ব্যবসায়ী জানান, মোটামুটি দুই মণ আড়াই মন যা খড়ি হয়, সেটা নিয়ে বাজারে বিক্রি করে তার সংসারের রুজি-রোজগার এবং মায়ের চিকিৎসা চালায়।
ভোলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পিয়ার জাহান জানান, মুখলেসুরকে একটি প্রতিবন্ধী ভাতা এবং তার মায়ের জন্য বিধবা ও বয়স্ক ভাতা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি ঈদের সময়ও তাদের সহায়তা করা হয়। তবে এই সামান্য সহায়তা বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়।
মা-ছেলের এই অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে সমাজের বৃত্তবানদের ও বিভিন্ন সংস্থাকে এই পরিবারের পাশে এগিয়ে আসার বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী।