টানা বৃষ্টিতে ব্যাগের ভেতরে আমে পচন; পরিবহন, কীটনাশক ও শ্রমিকের বাড়তি খরচে দিশেহারা আমচাষী

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আম উৎপাদনকারী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ আম উৎপাদন হলেও আমের সঠিক মুল্য না পাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে আমচাষী ও ব্যাবসায়ীরা। এছাড়া , টানা বৃষ্টিতে ব্যাগের ভেতরে আম পচে যাওয়া, কীটনাশক ও শ্রমিকের বাড়তি খরচ এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক চাষিই খরচ তুলতে পারছেন না।
কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় ৩৭ হাজার হেক্টর বাগানে উৎপাদিত আমের বড় অংশেই ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় ৩০ কোটি ফ্রুট ব্যাগ কিনতে চাষিদের ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ১৮০ কোটি টাকা। অথচ গত বছর যে ব্যাগের দাম ছিল সাড়ে ৩ টাকা, এবার সেটিই কিনতে হয়েছে সাড়ে ৬ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত দামে। আমচাষিদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ব্যাগের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই নিম্নমানের ব্যাগ কিনেছেন।
প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যভাগ পর্যন্ত আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগো ও গৌড়মতি জাতের আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়। এ পদ্ধতিতে আমের গায়ে দাগ পড়ে না, পোকার আক্রমণ কমে যায় এবং কীটনাশকের ব্যবহারও হ্রাস পায়। ফলে আমের গুণগত মান বৃদ্ধি পায় এবং দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশি বাজারেও চাহিদা তৈরি হয়। খোলা অবস্থার আম যে দামে বিক্রি হয়, ফ্রুট ব্যাগিং করা আমের দাম দিগুণ পাওয়াা যায়।
চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি ভিন্ন। গত বছর যেখানে প্রতিটি ফ্রুট ব্যাগ ৩ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৮০ পয়সায় পাওয়া গেছে, এ বছর সেই ব্যাগ কিনতে হয়েছে ৬ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত দামে। তাও প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যায়নি। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক চাষি পর্যাপ্ত পরিমাণ আমে ব্যাগিং করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বর্তমানে ফজলি আমের দাম প্রতি মণ মাত্র ১ হাজার আট শত থেকে দুই হাজার টাকা। এক কেজি ফজলি আমে সাধারণত দুটি আম থাকে এবং প্রতিটি আমে একটি করে ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করতে হয়। সে হিসাবে প্রতি কেজিতে শুধু ব্যাগের পেছনেই খরচ হচ্ছে প্রায় ১৩ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার, কীটনাশক, শ্রমিক, সেচ, পরিচর্যা ও পরিবহন ব্যয়। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশই চলে যাচ্ছে ব্যাগ ও কৃষি উপকরণে।
এবার মৌসুমজুড়ে কয়েক দফা বৃষ্টির কারণে অনেক বাগানে নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। চাষিদের দাবি, নিম্নমানের ব্যাগে পানি ঢুকে ব্যাগের ভেতরেই আম পচে যাচ্ছে। অনেক ব্যাগ ছিঁড়ে গিয়ে ভেতরে আর্দ্রতা জমছে। ফলে ব্যাগ খুলতেই বের হচ্ছে কালো ও পচা আম। বিশেষ করে ফজলি ও আশ্বিনা জাতের আমে এ সমস্যা বেশি দেখা গেছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার সত্রাজিতপুর গ্রামের আমচাষি শহিদুল ইসলাম জানান, প্রায় ৫০ মণ ফজলি আমে ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহার করেছেন। প্রতিটি ব্যাগ কিনতে হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ টাকা দরে। কিন্তু বর্তমানে বাজারে আমের দাম কম থাকায় উৎপাদন খরচই উঠছে না। তার দাবি, এবার ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহারের পরও প্রায় ৪০ শতাংশ আম নষ্ট হয়েছে।
মোবারকপুরব ইউনিয়নের আমচাষি আবদুর রহমান বলেন, মৌসুমের শুরু থেকেই সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও ফ্রুট ব্যাগের খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। এখন আবার পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এত খরচের পর বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লাভের বদলে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
শ্যামপুর ইউনিয়নের আমচাষি আনসারুল ইসলাম বলেন, প্রায় ৫০ হাজার ফ্রুট ব্যাগ কিনে সব আম ব্যাগিং করেছি। কিন্তু ব্যাগ খুলতেই বের হচ্ছে পচা আম। এমনভাবে নষ্ট হয়েছে যে গবাদিপশুকেও খাওয়ানো যায় না।
চাষিদের পাশাপাশি আম ব্যবসায়ীরাও বলছেন, চলতি মৌসুমে ডিজেল, ট্রাক ও পিকআপ ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলায় আম পাঠানোর পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিপণন ব্যয়ও যোগ হয়ে চাষির লাভ আরও কমে গেছে। অনেক ব্যবসায়ী বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কারণে কম দামে আম কিনছেন, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাগান মালিকদের ওপর।
চাষিরা জানান, এবার বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকের দাম গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। আমে রোগ-পোকা দমন ও মান ধরে রাখতে অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যয়ের বিপরীতে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
শিবগঞ্জ উপজেলা ম্যাংগো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব আহসান হাবিব বলেন, চলতি মৌসুমে ফ্রুট ব্যাগের ব্যাপক সংকট ছিল। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় অনেক চাষি নিম্নমানের ব্যাগ ব্যবহার করেছেন। ফলে ব্যাগ ছিঁড়ে যাওয়া, পানি ঢুকে যাওয়া এবং পোকামাকড়ের আক্রমণসহ নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিপণন কর্মকর্তা মো. মোমিনুল হক বলেন, আগামী মৌসুমে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাধ্যমে চাষিদের মধ্যে ফ্রুট ব্যাগ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইউনিয়নভিত্তিক বিজনেস স্কুলের মাধ্যমে চাষিদের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. আব্দুল হালিম বলেন, আমের সৌন্দর্য, গুণগত মান ও রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ফ্রুট ব্যাগের বিকল্প নেই। তবে অবশ্যই উন্নতমানের ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। নিম্নমানের ব্যাগ হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, ফজলি আমের সবচেয়ে বড় শত্রু ফ্রুট ফ্লাই। এ কারণে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। তবে ব্যাগের ভেতরে আম নষ্ট হলে বুঝতে হবে ব্যবহৃত ব্যাগের মান ভালো ছিল না। নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি ব্যাগে বাতাস চলাচল ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ঠিকভাবে না হওয়ায় এমন সমস্যা হতে পারে।
বাজারে মানসম্মত ফ্রুট ব্যাগের সরবরাহ নিশ্চিত, ব্যাগের দাম নিয়ন্ত্রণ, নিম্নমানের ব্যাগ বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান, পরিবহন ব্যয় কমাতে বিশেষ সহায়তা, কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হলে আগামী মৌসুমে তারা আবারও স্বাভাবিকভাবে উৎপাদনে ফিরতে পারবেন। বর্তমানে উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরের ব্যবধান কমানো না গেলে জেলার ঐতিহ্যবাহী আমচাষ বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।