
গ্রীষ্ম এলেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু হয় এক ভিন্ন ব্যস্ততা। বাগানে বাগানে পাকা-অপাকা আমের সুবাস, মোকামে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, ট্রাকভর্তি চালান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর প্রস্তুতি, সব মিলিয়ে জেলার অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। শুধু একটি ফল নয়, আমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি, লাখো মানুষের জীবিকা এবং বিস্তৃত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। দেশের অন্যতম আম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে এবারও শীর্ষে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
বিশেষ করে ফজলি, ক্ষীরশাপাত (হিমসাগর), ল্যাংড়া, গোপালভোগ ও আশ্বিনা জাতের আমের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট মোকাম। মৌসুম এলেই দেশের বৃহত্তম আম বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটিতে পরিণত হয় এই বাজার।
বর্তমানে কানসাট মোকামসহ জেলার বিভিন্ন আমের বাজারে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বেচাকেনা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু কানসাট মোকামেই প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার আম লেনদেন হচ্ছে। জেলাজুড়ে দৈনিক বেচাকেনার পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার কাছাকাছি। পুরো মৌসুমে জেলার আমভিত্তিক অর্থনীতির আকার সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
তবে মৌসুমের শুরুতে কানসাট বাজারে পর্যাপ্ত আম উঠলেও প্রত্যাশিত সংখ্যক ক্রেতা ও পাইকার না আসায় কিছুটা হতাশ চাষিরা। সরেজমিনে বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রবেশপথে সারি সারি আমভর্তি টুকরি নিয়ে অপেক্ষা করছেন চাষিরা। বাজারে আমের সরবরাহ ভালো থাকলেও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যাপারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
বর্তমানে বাজারে গুটি জাতের আম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, ল্যাংড়া ১ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার টাকা এবং ক্ষীরশাপাতি ১ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। আমের আকার ও গুণগত মান অনুযায়ী দামের তারতম্য দেখা যাচ্ছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার আমচাষি আমিনুল ইসলাম বলেন, বাজারে আম পর্যাপ্ত থাকলেও ক্রেতা কম। এ কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছি না। আম চাষে প্রচুর খরচ হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক দফা কীটনাশক প্রয়োগ ও শ্রমিক খরচ করতে হয়েছে। ভালো দাম না পেলে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
আরেক আমচাষি মনিরুল ইসলাম বলেন, এ বছর আমের দাম খুবই কম। বাগান পরিচর্যায় যে পরিমাণ খরচ হয়েছে, বর্তমান বাজার দরে তা উঠবে না। কৃষকরা হতাশ। আমরা আমের ন্যায্য মূল্য চাই।
অন্যদিকে বাজারে ৪০ কেজির পরিবর্তে ৫৪ কেজিকে এক মণ হিসেবে ধরা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে চাষিদের। তাদের অভিযোগ, এতে অতিরিক্ত ওজন দিতে হচ্ছে এবং লাভের একটি অংশ কমে যাচ্ছে।
ফরিদপুর থেকে আসা আম ব্যবসায়ী রিপন মিয়া বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার আমের দাম কম। বাজারে সরবরাহ বেশি হলেও ক্রেতা কম। তবে আগামী কয়েক দিনে পাইকারদের উপস্থিতি বাড়লে দামও বাড়তে পারে।
মাগুরা থেকে আসা ব্যবসায়ী শাহিন মাহফুজ বলেন, এবার আমের উৎপাদন ভালো হয়েছে। সরবরাহও বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের মান ভালো হওয়ায় প্রতিবছর এখান থেকে আম কিনতে আসি।
কানসাট আম বাজার আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রিয়াল বলেন, বাজারে চাষিদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে যানজট বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি।
কানসাট বাজারের ইজারাদার আমিনুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় চাষিরা কিছুটা কম দাম পাচ্ছেন। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসতে শুরু করেছেন। এখন পর্যন্ত কেনাবেচা স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম বলেন, কানসাট দেশের বৃহত্তম আমের হাটগুলোর একটি। যানজট নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন কাজ করছে।
এদিকে আমের মৌসুমকে ঘিরে জেলার হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বাগানের শ্রমিক, ঝুড়ি কারিগর, পরিবহন শ্রমিক, প্যাকেজিং কর্মী, কুরিয়ার সেবাকর্মী ও আড়তদারসহ নানা পেশার মানুষ এই মৌসুমি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও রপ্তানি সুবিধা বাড়ানো গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমভিত্তিক অর্থনীতি আরও সম্প্রসারিত হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন ও বাণিজ্যে নতুন রেকর্ড গড়ারও আশা করছেন তারা।