
এক মুহূর্তের জন্য ভাবুন আপনি এই পৃথিবীতে নেই। আত্মীয়-স্বজন ধীরে ধীরে আপনাকে ভুলে গেছে। আপনার বাড়ি, সম্পদ, পদ-পদবি সবই অন্যের হয়ে গেছে। কিন্তু ঠিক সেই সময়েও যদি আপনার আমলনামায় একের পর এক সাওয়াব যোগ হতে থাকে? তাহলে কেমন হবে? এটি কোনো কল্পনা নয়; বরং এটিই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুসংবাদ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ
‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৮৫)
মৃত্যু অবধারিত। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য সুসংবাদ হলো— কিছু নেক আমল মৃত্যুর পরও বন্ধ হয় না।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অমূল্য দিকনির্দেশনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল ব্যতীত— ১. সদকায়ে জারিয়া, ২. এমন উপকারী জ্ঞান, যা থেকে মানুষ উপকৃত হয় এবং ৩. নেককার সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম ১৬৩১)
১. নেককার সন্তান— আপনার জন্য দোয়া করবে
সন্তানকে শুধু দুনিয়ার সফল মানুষ নয়, আল্লাহভীরু বানানোর চেষ্টা করুন। কারণ একজন নেককার সন্তানের একটি আন্তরিক দোয়াও হতে পারে আপনার জান্নাতের কারণ। আল্লাহ তাআলা শিক্ষা দিয়েছেন—
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণ: ‘রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগিরা।’
অর্থ: ‘হে আমার রব! আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ২৪)
২. উপকারী জ্ঞান— একটি ভালো কথা, একটি কুরআনের শিক্ষা
আপনি কাউকে একটি সহিহ হাদিস শিখিয়ে দিলেন, কুরআন পড়া শেখালেন, একটি ইসলামি বই উপহার দিলেন, অথবা এমন একটি পোস্ট লিখলেন যা মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনল। আপনি চলে (মারা) যাওয়ার পরও যদি মানুষ সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে, তার সাওয়াব আপনার কাছেও পৌঁছাতে থাকবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের পথ দেখিয়ে দেয়, সে সেই কাজ সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করে।’ (মুসলিম ১৮৯৩)
৩. সদকায়ে জারিয়া— এমন দান, যার প্রতিদান চলতেই থাকবে
ভাবুন তো, আপনি একটি নলকূপ স্থাপন করলেন। বছরের পর বছর মানুষ সেই পানি পান করছে। অথবা—
>>একটি মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা করলেন।
>>একটি কুরআন দান করলেন।
>>একটি গাছ রোপণ করলেন।
>>এতিমখানা, মাদরাসা বা দ্বীনি শিক্ষার কাজে সহযোগিতা করলেন।
যতদিন মানুষ উপকৃত হবে, ততদিন ইনশাআল্লাহ আপনার আমলনামায় সাওয়াব লেখা হতে থাকবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَغْرِسُ غَرْسًا أَوْ يَزْرَعُ زَرْعًا، فَيَأْكُلُ مِنْهُ إِنْسَانٌ أَوْ طَيْرٌ أَوْ بَهِيمَةٌ، إِلَّا كَانَ لَهُ بِهِ صَدَقَةٌ
‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে বা ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা কোনো প্রাণী আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (বুখারি ২৩২০, মুসলিম ১৫৫৩)
কুরআনের এক অনন্য আশ্বাস
আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّا نَحْنُ نُحْيِي الْمَوْتَىٰ وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ
‘নিশ্চয়ই আমরাই মৃতদের জীবিত করব এবং তারা যা আগে পাঠিয়েছে ও তাদের রেখে যাওয়া প্রভাবসমূহও লিপিবদ্ধ করি।’ (সুরা ইয়াসিন: আয়াত ১২)
আমরা সবাই একদিন চলে যাব। সঙ্গে যাবে না আমাদের বাড়ি, সম্পদ বা পরিচিতি। সঙ্গে যাবে শুধু ইমান ও নেক আমল। তাই আজ থেকেই এমন কিছু রেখে যাওয়ার চেষ্টা করি, যা আমাদের মৃত্যুর পরও আখিরাতের পাথেয় হয়ে থাকবে—
>>একটি নেককার সন্তান...
>>একটি উপকারী জ্ঞান...
>>একটি সদকায়ে জারিয়া...
হয়তো এই তিনটির কোনো একটিই হবে আপনার নাজাতের কারণ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের এমন জীবন দান করুন, যার নেকির ধারা মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। তিনি আমাদের আমলগুলো কবুল করুন এবং আখিরাতকে আমাদের জন্য কল্যাণময় করে দিন। আমিন।