
বিস্ময়কর, বিতর্কিত এবং চরম নাটকীয়তায় ভরপুর এক ম্যাচের মধ্য দিয়ে শেষ হলো মিশরের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ অভিযান। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হারলেও ফারাওরা মাথা উঁচু করেই বিদায় নিয়েছে।
তবে রেফারির বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তে মিশরের খেলোয়াড় ও ভক্তদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
ম্যাচে এক পর্যায়ে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় এড়াতে পারেনি মিশর।
৮৩ মিনিটে লিওনেল মেসির সমতাসূচক গোল এবং ইনজুরি সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনসো ফার্নান্দেসের করা জয়সূচক গোলে এক অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটায় আর্জেন্টিনা। এই জয়ের মাধ্যমেই শিরোপা ধরে রাখার মিশনে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিট ছিল চরম উত্তেজনায় ঠাসা। রেফারির বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার একাধিক ফাউল এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
বিশেষ করে ভিএআর-এর বিতর্কিত কলে মোস্তফা জিকোর একটি গোল বাতিল করা মিশরের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। এছাড়া কোচ হোসাম হাসানসহ মিশরের চারজন সদস্যকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়। উত্তেজনার এক পর্যায়ে কোচ হাসান দুই হাত দিয়ে "X" চিহ্ন প্রদর্শন করেন, যা বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ এবং ফিফার অ্যান্টি-রেসিজম প্রোটোকল সচল করার একটি আন্তর্জাতিক সংকেত। নিয়ম অনুযায়ী এটি দেখা মাত্র রেফারির খেলা থামিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত থাকলেও, তিনি কয়েক মিনিট পর কেবল শেষ বাঁশি বাজানোর সময়ই সেটি খেয়াল করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটিজেনরা মিশরের প্রতি এই ‘অবিচারের’ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। হারলেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের নায়ক এই ফারাওদের নৈতিক সমর্থন দিচ্ছে পুরো বিশ্ব। মিশরীয় ফুটবল ফেডারেশন টুইট করে দলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, ‘তোমরা অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছ। আমরা তোমাদের নিয়ে গর্বিত। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।’
পরাজয় সত্ত্বেও পুরো আরব বিশ্ব মিশরের প্রতি ভালোবাসা ও গর্বের বার্তা পাঠাচ্ছে। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এক ‘সম্মানজনক পারফরম্যান্সের’ জন্য দলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমরা তোমাদের নিয়ে এবং তোমাদের এই অর্জনে গর্বিত। তোমাদের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল।’
একজন মিশরীয় সমর্থক খেলোয়াড়দের মনে করিয়ে দেন, ‘কোচ হোসাম হাসান যেভাবে ফিলিস্তিনের পতাকা উঁচিয়ে ধরেছিলেন, তোমরাও ঠিক সেভাবেই মাথা উঁচু করে রাখবে।’
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে নিয়ে হাসান বলেছিলেন, ‘আমি এই জয় মিশর ও ফিলিস্তিনের সেই লড়াকু ও সম্মানিত মানুষদের উৎসর্গ করছি।’
যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত এবং গাজার সাধারণ মানুষ রেফারির সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। গাজার এক ভক্ত তার আবেগের কথা জানিয়ে এক্সে লিখেছেন, ‘ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ানো আর গাজার কথা বলার অপরাধেই কি একটি দলকে বিশ্বকাপ থেকে এভাবে বিদায় নিতে হলো? আমরা বোমার ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তাদের প্রতিটি গোলের পর আনন্দে কেঁদেছি। ফিফা একজন পক্ষপাতদুষ্ট রেফারি দিয়ে আমাদের সেই শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিল।’
আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনেও এই রেফারিং নিয়ে সমালোচনা চলছে। লিভারপুল লিজেন্ড জেমি ক্যারাঘার বলেন, ‘আমি নিশ্চিত এই গোলটি অন্য কোনো দলের বিপক্ষে হলে তা বাতিল করা হতো না। প্রিমিয়ার লিগ বা লা লিগায় এটি নিশ্চিত গোল ছিল।’
অন্যদিকে, প্রতিবেদন বলছে পর্তুগিজ কোচ হোসে মরিনিয়ো এই ম্যাচটিকে ‘দিনের আলোতে ডাকাতি’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গোল হওয়ার পর সেটি বাতিল করা লজ্জাজনক। ফাউল হলে খেলা তখনই থামানো উচিত ছিল, গোল পর্যন্ত অপেক্ষা করা নয়।’
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কোচ হোসাম হাসান ক্ষোভের সাথে জানান, ‘আমি আজই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি এবং এই টুর্নামেন্টের আর কোনো ম্যাচ আমি দেখব না। আমাদের সাথে যা হয়েছে তা মোটেও ন্যায্য নয়। আমাদের পেনাল্টি দেওয়া হয়নি, গোল বাতিল করা হয়েছে। আমি জানি না কেন এমনটা হলো।’
তবে হারলেও পরাজয় মানতে রাজি নন ভক্তরা। অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহ এবং তার দলকে হোটেলের বাইরে হাজারো সমর্থক বীরোচিত অভ্যর্থনা জানান। লাল আতশবাজিতে আকাশ রাঙিয়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাদের হৃদয়ে মিশরের ফারাওরা বিজয়ী হিসেবেই জায়গা করে নিয়েছে।