
জাতীয় বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ ব্যবসায়ীদের চাহিদা নয়, বরং রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চাপের ফল বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান।
তিনি বলেন, যে ব্যবসায়ী কর দিতে চান না, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকুক বা না থাকুক তিনি কর দেবেন না।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘জাতীয় বাজেটে কর ন্যায্যতা: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব প্রস্তাবনার ওপর পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। সংলাপের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমানোর আহ্বান জানিয়ে রিজওয়ান রাহমান বলেন, এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে বিভাজন রয়েছে, তা দূর করতে হবে। এনবিআরের নীতি বিভাগ (পলিসি উইং) ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা প্রশাসনিক বিভাগ বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি বলেন, একসঙ্গে সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। কাউকে রাজনৈতিকভাবে, কাউকে অর্থনৈতিকভাবে সন্তুষ্ট করতে হয়। বিভিন্ন দিক থেকে নানা ধরনের চাপ আসে।
কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কোনো ব্যবসায়ীর দাবি নয়। যে ব্যবসায়ী কর দিতে চায় না, সে কর দেবেই না। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়ে তার কোনো সমস্যা নেই। এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক চাপ থেকেই আসে। অতীতের অভিজ্ঞতাও তাই বলে।
আবাসন খাতে নতুন কর আরোপের সমালোচনা করে রিজওয়ান রাহমান বলেন, এর ফলে ফ্ল্যাট ও বাড়ির দাম আরও বাড়বে। ইতোমধ্যে বিশ্বের অনেক প্রথম সারির শহরের তুলনায় বাংলাদেশে আবাসন কেনা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। করের বোঝা আরও বাড়ানো হলে অনেকে দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে সম্পদ কেনার দিকে ঝুঁকতে পারেন।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত শক্তিশালী না হলে দেশের মানুষ বিদেশে পড়াশোনা ও চিকিৎসার জন্য ছুটবে। আমাদের মানসিক নিরাপত্তার জায়গাটি এখনও তৈরি হয়নি। যত ধরনের সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া হোক না কেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে দুর্নীতি কমাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতো জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
এ সময় ‘ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি কমিশন’ (জাতীয় জবাবদিহি কমিশন) গঠনের প্রস্তাব দিয়ে রিজওয়ান রাহমান বলেন, যারা নীতি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য একটি কার্যকর কাঠামো প্রয়োজন।
কর প্রশাসনের আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এনবিআরের পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সম্ভব হবে।
সংলাপে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা যেসব দাবি জানিয়ে আসছিলেন, বাজেটে তার কিছু প্রতিফলন দেখা গেছে। তবে কিছু নতুন কর ব্যবস্থা শিল্প খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, একাধিক কোম্পানির মধ্যে আর্থিক লেনদেনের ওপর নতুন করে সুদ ও কর আরোপের বিধান শিল্পের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করবে।
হাতেম বলেন, কোনো একটি কোম্পানি আর্থিক সংকটে পড়লে অন্য কোম্পানি থেকে অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। এখন সেই অর্থের ওপর বারবার কর ও সুদ আরোপের বিধান করা হয়েছে। এটি শিল্পকে নিরুৎসাহিত করবে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের বিধান কে বা কারা যুক্ত করেছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে দেশের শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্ত করা উচিত।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, কর ন্যায্যতা শুধু বাজেট ঘোষণার সময় আলোচনার বিষয় হতে পারে না। বাজেট প্রণয়নের আগে ও পরে অংশীজনদের মতামত বিবেচনায় নেওয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া থাকতে হবে।
তিনি বলেন, কর ব্যবস্থা ন্যায়সঙ্গত করতে হলে ব্যবসায়ী, করদাতা, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।
এনবিআর সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারলে রাষ্ট্রের পক্ষে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় জনসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, কর ন্যায্যতা ও রাজস্ব আহরণ একে অপরের পরিপূরক। জনগণের আস্থা অর্জন করে কর আদায় বাড়াতে হলে কর ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক করতে হবে।
এর আগে সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামিম আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর ফাঁকি ও কর এড়ানোর কারণে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ভ্যাট আয়ের মাত্র ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছে এনবিআর।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। কিন্তু বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাব অনেক সময় এক শ্রেণির জন্য সুবিধাজনক হলেও অন্য শ্রেণির জন্য বৈষম্য তৈরি করে। তাই কর ন্যায্যতার বিষয়টি শুধু কর কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থা ও সম্পদের বণ্টনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।