বুধবার ২৪ জুন ২০২৬ ৯ আষাঢ় ১৪৩৩

শিরোনাম: ঝিকরগাছায় যুবদল ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল   কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং নিয়ে ফরিদ সিন্ডিকেটের বাণিজ্য   হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপ নিয়ে যা বলল ইরান   রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজিবি মোতায়েন   অবৈধ সম্পদ মামলায় বেনজীরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ, পরবর্তী শুনানি অপেক্ষায়   ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, ফ্রান্সে প্রাণ গেল ১৮ জনের   বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বার্তা মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রীর   
কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং নিয়ে ফরিদ সিন্ডিকেটের বাণিজ্য
মোহাম্মদ শফিক, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৫:৩৭ পিএম   (ভিজিট : ১৩৮)

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্যারাসেইলিং কার্যক্রম এখন পর্যটকদের জন্য আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সৈকতের দরিয়ানগর পয়েন্টে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে ইঞ্জিন বিকল হওয়া, দড়ি ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পর্যটক সাগরে বা ঝাউবনে ছিটকে পড়ার মতো দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে বলে জানা গেছে।

এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণে প্রশাসন কয়েকবার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করলেও অভিযোগ রয়েছে, ফরিদ সিন্ডিকেট জেলা প্রশাসনের কতিপয় লোকজনকে ম্যানেজ করে পুনরায় কার্যক্রম চালু করে। এতে একদিকে যেমন পর্যটকরা দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে মাত্র ৪-৫ মিনিটের প্যারাসেইলিং রাউন্ডের জন্য ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রশাসনের কঠোর মনিটরিং ও জবাবদিহিতা না থাকায় বেপরোয়াভাবে পর্যটকদের ঠকাচ্ছে এই সিন্ডিকেটটি।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর ও হিমছড়ি পয়েন্টে প্যারাসেইলিংয়ের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং চরম অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পর্যটকদের ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ফরিদ নামে একজন বহিরাগত ব্যক্তি এসব কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত। শুধু তিনি নন, আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অতিরিক্ত মূল্য আদায়, লাইসেন্স ছাড়া পরিচালনা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না রাখার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ফরিদের মালিকানাধীন প্যারাসেইলিং কার্যক্রমে দড়ি ছিঁড়ে এক পর্যটক সমুদ্রে পড়ে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে বলেও স্থানীয়দের দাবি। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকদিনের জন্য এ কার্যক্রম বন্ধ করা হলেও পরে পুনরায় তা চালু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া পর্যটকদের অন্যতম বিনোদন স্পট দরিয়ানগর এখন ঝুপড়ি স্থাপনা ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, ফরিদ ওই পুরো এলাকা নিজের পৈতৃক সম্পত্তির মতো দখলে নিয়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। এসব অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি একটি বখাটে সিন্ডিকেটও গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্যারাসেইলিংয়ের আড়ালে রাতে সমুদ্রপথে মাদকের চালান পাচারের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকাটি কলুষিত হয়ে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য দিন দিন অনিরাপদ স্পটে পরিণত হচ্ছে। তারা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নিরাপত্তা মান যাচাই, এয়ারফোর্স ও নেভির অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে টেকনিক্যাল মূল্যায়ন, যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিটি রাইডের নির্ধারিত মূল্য তালিকা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত অবৈধ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন।

পর্যটক দম্পতি হারুন-উর-রশিদ ও সেলিনা মণ্ডলসহ বেলায়েত হোসেন, হাবিব হক, শাহনেওয়াজ চৌধুরীসহ অনেকেই বলেন, “প্যারাসেইলিং করার আগে আমাদের প্রায় আধাঘণ্টা রাইড দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে মাত্র ১০ মিনিটের মতো রাইড করিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। এজন্য আমাদের কাছ থেকে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। এছাড়া সেখানে কোনো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। এগুলো প্যারাসেইলিংয়ের নামে পর্যটকদের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা এবং জীবন নিয়ে মরণখেলা। যে লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হয়, তা একজন মানুষের ওজন ধরে রাখার মতো মানসম্মত নয়। কার্যকর রেসকিউ বোটও নেই। আমাদের দাবি, ভোক্তা অধিকারের মাধ্যমে প্রতিটি রাইডের মূল্য তালিকা টানিয়ে দেওয়া হোক এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক।”

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, “প্যারাসেইলিংয়ের নামে পর্যটকদের জীবন নিয়ে মরণখেলা খেলছে ফরিদ সিন্ডিকেট। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পর্যটকদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটার পরও কীভাবে জেলা প্রশাসন পুনরায় অনুমতি দেয়, সেটিই প্রশ্ন। নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো লেনদেন থাকতে পারে। বড় কোনো দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের শুভবুদ্ধির উদয় হলে তখন আর লাভ হবে না। নিরাপত্তা মান যাচাই, এয়ারফোর্স ও নেভির অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দিয়ে টেকনিক্যাল মূল্যায়ন, যথাযথ প্রশিক্ষণ, ভোক্তা অধিকার কর্তৃক রাউন্ডের মূল্য তালিকা এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত অবৈধ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।”

কক্সবাজার জেলা সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, “প্যারাসেইলিংয়ের মালিকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কঠোর মনিটরিং করতে হবে। পর্যটক বা রাইডারদের ইনস্যুরেন্সের আওতায় আনা উচিত, যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তারা ক্ষতিপূরণ পান। এছাড়া প্যারাসেইলিং কার্যক্রমের কারণে বিমানের ফ্লাইট রুটে মাঝ-আকাশে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রাখতে হবে। বিশেষ করে পর্যটন এলাকায় এ ধরনের বিনোদনমূলক ও অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস চলাকালীন সতর্কতা অবলম্বন না করলে এয়ার ট্রাফিকের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।”

এ বিষয়ে ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফরিদ বলেন, “প্রতিবছর আমরা জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শাখা ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির অ্যাকাউন্টে ২ লাখ টাকা দিয়ে কার্ড নবায়ন করি। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য টাকা প্রদান করার পরও জেলা প্রশাসন কার্ড নবায়ন করেনি।”

কার্ড নবায়ন ছাড়া কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তাদের সঙ্গে ঝগড়া কিংবা জোরাজুরি করে কি কার্ড নিতে পারব? ম্যানেজ করে ব্যবসা পরিচালনা করছি।”

এ বিষয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক গোলাম মর্তুজা জানান, “মেরিন ড্রাইভের দরিয়ানগর ও হিমছড়ি পয়েন্টে কয়েকটি প্যারাসেইলিং কার্যক্রম আছে। তবে ফ্লাইট রুটে মাঝ-আকাশে যেন সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি না হয়, সে উচ্চতার নিরাপত্তার বিষয়টি সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ দেখে। যেমন দরিয়ানগর এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০ ফুটের মধ্যে প্যারাসেইলিং করা যায়। এ বিষয়ে কয়েকজনের অনুমতি রয়েছে। তবে সেগুলো হালনাগাদ আছে কি না, দেখতে হবে।”

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মামুন আহমেদ অনীক বলেন, “প্যারাসেইলিংয়ের পরিবেশগত গুণগত মান, নিরাপত্তা এবং নিয়মকানুন ঠিক আছে কি না, তা পরিদর্শন করে অনুমতি দেওয়া হবে।”

অন্যদিকে কক্সবাজারের সুশীল সমাজের প্রশ্ন, পাহাড়, সমুদ্র আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে মেরিন ড্রাইভ এলাকায় কীভাবে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ প্যারাসেইলিংয়ের অনুমতি মেলে?

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আঃ মান্নান জানান, “প্যারাসেইলিং কার্যক্রমের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের কী অনুমতি আছে, তা আমার সঠিক জানা নেই। দেখে বলতে হবে।”

যেভাবে পর্যটকদের ঠকানো ও ঝুঁকিতে ফেলা হয়

গলাকাটা মূল্য আদায়: নির্ধারিত প্যাকেজের চেয়ে পর্যটকদের কাছ থেকে কয়েকগুণ বেশি টাকা দাবি করা হয়। অতিরিক্ত রাইড টাইমের লোভ দেখিয়েও প্রতারণা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা: অনেক অপারেটর নিয়মের তোয়াক্কা না করে অতিরিক্ত মুনাফার জন্য একসঙ্গে একাধিক মানুষকে রাইডে উড্ডয়ন করায়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

যান্ত্রিক ত্রুটি ও নিম্নমানের সরঞ্জাম: পুরোনো দড়ি, নিম্নমানের লাইফ জ্যাকেট এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পর্যটকরা আকাশে ওঠার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সাগরে বা ঝাউগাছে ছিটকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

পর্যটকদের বাড়তি আনন্দকে পুঁজি করে আকাশে পাখির মতো ওড়ানোর নামে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট প্যারাসেইলিং করিয়ে ১ হাজার ৫০০, ২ হাজার, ২ হাজার ৫০০ এমনকি ৫-৬ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, নির্ধারিত মূল্য তালিকা, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এসব ঝুঁকিপূর্ণ প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখা জরুরি।









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]