বুধবার ২৪ জুন ২০২৬ ১০ আষাঢ় ১৪৩৩

শিরোনাম: সাতক্ষীরা ডিসির বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক, উঠল বিকৃত প্রচারের অভিযোগ   সৌদির নতুন সিদ্ধান্ত: বিদেশিদের জন্য সম্পত্তি কেনার সুযোগ   বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশের তানভীর শেখ   ভূমিকম্পে ঢাকার কোন এলাকায় ঝুঁকি কম, কোথায় বেশি   আমকে ঘিরে বদলে যাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি   হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর প্রাণহানি   শ্রম আইনের মামলায় জামিনে মুক্ত নাভানা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান   
আমকে ঘিরে বদলে যাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ৫:০১ পিএম   (ভিজিট : ৭৫)

বাংলাদেশের আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ এখন শুধু ফল উৎপাদনের জেলা নয়, ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে কৃষিভিত্তিক পর্যটনেরও অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। বিস্তীর্ণ আমবাগান, দেশের বৃহত্তম আমের মোকাম কানসাট বাজার এবং অনলাইনভিত্তিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, সব মিলিয়ে আমকে কেন্দ্র করে বদলে যাচ্ছে জেলার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার চিত্র।

আম মৌসুমে  বাগানে বাগানে পাকা-অপাকা আমের সুবাস, মোকামে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, ট্রাকভর্তি চালান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর প্রস্তুতি, সব মিলিয়ে জেলার অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। শুধু একটি ফল নয়, আমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি, লাখো মানুষের জীবিকা এবং বিস্তৃত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। দেশের অন্যতম আম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে এবারও শীর্ষে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। প্রতি বছর জেলায় প্রায় সাড়ে  চার লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। এর বড় একটি অংশ কেনাবেচা হয় শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট আমবাজারে, যা দেশের সবচেয়ে বড় আমের মোকাম হিসেবে পরিচিত। দুই থেকে আড়াই মাসব্যাপী চলা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার আমের লেনদেন হয় এই বাজারে। পুরো মৌসুমে লেনদেনের পরিমাণ শত শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং জেলার আমনির্ভর অর্থনীতির আকার দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকায়।

ভোর থেকেই কানসাট বাজারে শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। দূর-দূরান্ত থেকে আমভর্তি ভ্যান, পিকআপ ও ট্রাক এসে ভিড় জমায়। আড়তজুড়ে চলে ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, আম বাছাই, প্যাকেজিং ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর প্রস্তুতি। বাজারের প্রতিটি মুহূর্ত যেন হাজারো মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিচ্ছবি।

বর্তমানে বাজারে গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাত (হিমসাগর) ও ল্যাংড়া আমের সরবরাহ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এরপর  বাজারে আসবে ফজলি, আম্রপালি, আশ্বিনা ও গৌড়মতি জাতের আম। এছাড়া বিভিন্ন বিদেশি জাতের আমও পাওয়া যাচ্ছে। জাত ও গুণগত মান অনুযায়ী প্রতি মণ আমের দাম সাধারণত ৮০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে।

কানসাটের একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো এখানকার প্রচলিত ‘ঢলতা’ পদ্ধতি। দেশের অন্য বাজারে যেখানে ৪০ কেজিকে এক মণ ধরা হয়, সেখানে কানসাট ও আশপাশের আড়তগুলোতে ৫৪ কেজিকে এক মণ হিসেবে আম কেনাবেচার রীতি বহুদিন ধরে চলে আসছে।

আমের ব্যবসার পাশাপাশি জেলার বিস্তীর্ণ আমবাগান এখন মৌসুম জুড়ে ভ্রমণপিপাসু মানুষের পদচারণায় মুখর। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন বাগান দেখতে, গাছ থেকে আম পাড়ার অভিজ্ঞতা নিতে এবং প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে।

কানসাট বাজারের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে সামনের দিকে  এগোলেই নতুন দৃশ্যপট। চারদিকে সারি সারি আমগাছ, ডালে ডালে ঝুলে থাকা পাকা আম আর ছায়াঘেরা সবুজ পরিবেশ যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ। একসময় যেসব বাগান কেবল ফল উৎপাদনের ক্ষেত্র ছিল, এখন সেগুলোই মৌসুমভিত্তিক পর্যটনের নতুন গন্তব্যে ।
ঢাকা থেকে আসা এক পরিবারের সাথে দেখা হোল কানসাট রাজার বাগান। তিনি বলেন তারা প্রথমবারের মতো গাছ থেকে সরাসরি আম পাড়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, যা তাদের কাছে হয়ে উঠছে স্মরণীয় মুহূর্ত। ঘুরতে আসা অন্য এক অভিভাবক জানান, সন্তানকে বইয়ের বাইরে প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত করাতে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে এসেছেন। খোলা পরিবেশ, আমবাগানের সৌন্দর্য এবং নিজ হাতে আম সংগ্রহের সুযোগ শিশুর কাছে ছিল সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা।

বিশেষ করে শিশুদের জন্য এই অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে ব্যতিক্রমী। শহুরে পরিবেশে বেড়ে ওঠা অনেক শিশু প্রথমবারের মতো গাছে ঝুলে থাকা পাকা আম দেখছে, নিজ হাতে আম পাড়ছে এবং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। তাদের কাছে আমবাগানগুলো ধীরে ধীরে কৃষিভিত্তিক পর্যটনের নতুন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অনলাইন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে সরাসরি বাগানের তাজা আম পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমছে, একই সঙ্গে উৎপাদকও পাচ্ছেন ভালো দাম।

ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শক্তিশালী ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের কারণে প্রত্যন্ত গ্রামের চাষিরাও এখন অনলাইনে অর্ডার গ্রহণ, বিক্রয় এবং কুরিয়ার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সহজেই ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন। আমের মৌসুমে বাড়তি ব্যবহারকারীর চাপ সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরগুলোও নেটওয়ার্ক সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে।

স্থানীয়দের মতে, আমকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং পরিবহন, প্যাকেজিং, কুরিয়ার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পর্যটন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, পর্যটন অবকাঠামো এবং ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করা গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ‘ম্যাঙ্গো ট্যুরিজম’ ভবিষ্যতে দেশের কৃষিভিত্তিক পর্যটনের অন্যতম সফল মডেলে পরিণত হতে পারে।









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]