
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। শহর থেকে গ্রাম, সবখানেই দিনের পাশাপাশি রাতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ। বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিন-রাত মিলিয়ে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি হওয়ায় কৃষিকাজে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। বিশেষ করে চলতি বোরো মৌসুমে সেচনির্ভর চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের কৃষক মাসুদ রানা বলেন, এই সময় জমিতে নিয়মিত পানি দিতে হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ বারবার চলে যাওয়ায় সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে না। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
একই চিত্র দেখা গেছে শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলেও। অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে অনেক এলাকায় সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
শহরাঞ্চলেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। পৌরসভার আরামবাগ এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। ফ্রিজের খাবার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা এনামুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দিনের বেলায় লোডশেডিং মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু মধ্যরাতে যখন বিদ্যুৎ চলে যায়, তখন শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম কষ্টে পড়তে হয়। গরমে কারো চোখেই ঘুম থাকে না। আবার চোখে ঘুম নিয়ে কাজে বের হতে হয়।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতেও। বিদ্যুৎ না থাকায় দাপ্তরিক কাজ, কম্পিউটার পরিচালনা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রিন্ট করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, চলতি ফুটবল মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো দেখতে বসেও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো ফুটবলপ্রেমী। খেলা চলাকালীন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তাদের আনন্দ মাটি হচ্ছে।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। ক্লাব সুপার মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী রাজিম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরমে ক্রেতারা বেশিক্ষণ দোকানে থাকতে চান না। ফলে বিক্রিও কমে গেছে।
পৌর এলাকার অক্টোমোড়ের লন্ড্রি ব্যবসায়ী সুজন জানান, স্বাভাবিক সময়ে তিনি প্রতিদিন প্রায় ১৫০টি জামা-কাপড় ইস্ত্রি করতেন। কিন্তু বর্তমানে ঘন ঘন বিদ্যুৎ না থাকায় সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টিতে। দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তাকে বসে থাকতে হচ্ছে, ফলে আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। পৌর এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রশিদ নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, আমাদের এলাকার বিদ্যুৎ ঠিক যেন হোমিওপ্যাথিক ডোজের মতো, এক ঘণ্টা পরপর ৩০ গুলি। একই সঙ্গে তিনি অন্য এলাকার বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কেও জানতে চান।
বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিক্রয়-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোহাইমিনুর রহমান জানান, জেলা শহরে বর্তমানে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩২ মেগাওয়াট। কিন্তু মঙ্গলবার (১৬ জুন) তারা জাতীয় গ্রিড থেকে পেয়েছেন মাত্র ২২ থেকে ২৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ফলে ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়ে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হঠাৎ করেই বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে।
নেসকো বিক্রয়-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাদিকুল ইসলাম জানান, হুজরাপুর, নয়াগোলা ও বটতলাহাট, এই তিনটি সাবস্টেশনে মোট বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪১ মেগাওয়াট। অথচ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৪ থেকে ৩০ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে, যা লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার হাওলাদার মো. ফজলুর রহমান জানান, গত ১৩ জুন থেকে হরিপুর গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় মহানন্দা নদীর ওপারের এলাকাগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। তবে নদীর এপারের আমনুরা ও নাচোল এলাকায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে রাতের পিক আওয়ারে তাদের চাহিদা প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫৩ থেকে ৫৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তবে খুব দ্রুত জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তোসিকুল ইসলাম বলেন ঘন ঘন লোডশেডিং এর কারনে অটো রাইস মিল মালিক গন বেশি বিপদে পড়েছেন,কারন চাহিদা অনুযায়ী চাল উতপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ব্যাবস্থা নেয়া উচিত।
নবাব অটো রাইস মিল মালিক আকবর হোসেন জানান লোডশেডিং এর কারনে চালসহ অন্যন্য প্রডাক্ট উতপাদনে হ্রাস ও বেশি বেতন গুনতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। একদিকে তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সেচনির্ভর কৃষি এলাকায় অতিরিক্ত বিদ্যুতের প্রয়োজন হওয়ায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা এবং কৃষিখাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের মতো বিকল্প উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে লোডশেডিং আর শুধু সাময়িক ভোগান্তির বিষয় নয়। এটি কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা, অফিস-আদালত এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এই সংকট জেলার অর্থনীতি ও উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।