
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী ও নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭ উপলক্ষে প্রসঙ্গ নজরুল-সঙ্গীত (প্রনস) আয়োজিত এক মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর ধানমণ্ডি ক্লাবের মাল্টি পারপাস হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে নজরুলপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে মিলনায়তন। বিদ্রোহ, প্রেম, মানবতা ও সাম্যের কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে যেন এক সুরসিক্ত আবহে ভেসে যায় পুরো আয়োজন।
প্রচ্ছদ চৌধুরী ও নাজমুন নাহার মিতার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। স্বাগত বক্তব্যে প্রনসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাংগঠনিক সম্পাদক রফিক সুলায়মান সংগঠনের পথচলা, নজরুলচর্চার গুরুত্ব এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে কবির সৃষ্টিকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন। আলোচনায় তিনি নজরুলের দার্শনিক চিন্তার বিষয়গুলোকে তুলে আনেন।
এরপর সংগঠনের প্রচার সম্পাদক আল মেরাজ আবৃত্তি করেন নজরুলের স্বদেশ পর্যায়ের গীতিকবিতা ‘নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম।’
আবৃত্তি শেষে শুরু হয় নজরুল-সঙ্গীতের বর্ণিল আসর। ত্রিবেণী পান্না তার সুমধুর কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া।’ শরীফা শিরীনের কণ্ঠে ‘ধুলি-পিঙ্গল জটাজুট মেলে’ গানটি শ্রোতাদের নিয়ে যায় ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার এক অন্য ভুবনে। নূরুন্নাহার মুনা পরিবেশন করেন ‘হে প্রিয়, তোমার আমার মাঝে বিরহের পারাবার’— যেখানে বিরহের বেদনামাখা সুর মিশে যায় হৃদয়ের গভীরে। নাদিয়া আরেফিন শাওনের কণ্ঠে ‘যাক না নিশি গানে গানে’ গানটি সন্ধ্যার আবহকে করে তোলে আরও স্নিগ্ধ ও মাধুর্যময়।
খ্যাতিমান নজরুল-সঙ্গীত শিল্পী নাশীদ কামাল তার অনবদ্য পরিবেশনায় ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো’ এবং ‘যাও যাও তুমি ফিরে’ গান দুটির মাধ্যমে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের আবেগাপ্লুত করে তোলেন। রেবেকা সুলতানা পরিবেশন করেন ‘আমার বিফল পূজাঞ্জলি’ এবং ‘রুমা ঝুম রুমা ঝুম ঝুম ঝুম’—যার প্রতিটি সুর ও উচ্চারণে ফুটে ওঠে নজরুল-সঙ্গীতের স্বতন্ত্র সৌন্দর্য।
প্রজন্মের জনপ্রিয় শিল্পী শহীদ কবির পলাশের কণ্ঠে ‘পরদেশী বধুয়া, এলে কি এতদিনে’ এবং ‘বসিয়া নদীকূলে এলো চুলে কে উদাসিনী’ গানদুটি বিশেষভাবে দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। প্রনস পরিবারের সাধারণ সম্পাদক পারভীন সুলতানা পরিবেশন করেন ‘আজও মধুর বাঁশরী বাজে'’এবং ‘আবার ভালোবাসার সাধ জাগে’। তার পরিবেশনায় প্রেম, প্রকৃতি ও মানবিক অনুভূতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ধরা পড়ে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন উস্তাদ ইয়াকুব আলী খান। তার দরাজ ও মায়াময় কণ্ঠে ‘দাঁড়ালে দুয়ারে মোর’ এবং ‘রুমা ঝুমা কে এলে নূপুর পায়’ পরিবেশিত হলে পুরো মিলনায়তন করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
সঙ্গীত পরিবেশনার পাশাপাশি এ বছর বাংলা একাডেমি, নজরুল ইন্সটিটিউট এবং চ্যানেল আই নজরুল পদক প্রাপ্ত শিল্পী ফাতেমাতুজ জোহরা, শিল্পী মইদুল ইসলাম, গবেষক রশিদুন নবী এবং শিল্পী শহীদ কবির পলাশকে প্রনসের পক্ষ থেকে সংবর্ধিত করা হয়।
নজরুলের গান, কবিতা ও সম্মাননা প্রদানের অনুপম সমন্বয়ে সাজানো এই আয়োজন শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; ছিল কবির প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার এক সুরময় প্রকাশ। বিদ্রোহী কবির জন্মজয়ন্তীতে তার অমর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা সেই অনির্বাণ আলোর শিখাই যেন নতুন করে জ্বলে উঠল প্রনস আয়োজিত এই স্মরণীয় সন্ধ্যায়।