
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে জামায়াত মনোনীত এমপি প্রার্থী বিপুল ভোটে জয় লাভ করেছে। ফলাফল ঘোষণার পর শুরু হয়েছে নানা হিসাবনিকাশ। কোন সমীকরণে কোন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন আর কোন প্রার্থী কেন পরাজিত হয়েছেন সেসব আলোচনাই এখন চলছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ড. কেরামত আলী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মোট ২ লাখ ৬ হাজার ৮৯৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক শাহজাহান মিঞা, যিনি ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৬২ হাজার ৫১৫ ভোট; ফলে দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ৩৭৮।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (নাচোল–গোমাস্তাপুর ও ভোলাহাট) আসনে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ড. মিজানুর রহমান মোট ১ লাখ ৭১ হাজার ২২৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম, যিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৫৫ হাজার ১১৯ ভোট, ফলে দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ১৬ হাজার ১০৮।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ–৩ (সদর) আসনে নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮৫ হাজার ১৬৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের হারুনুর রশীদ পেয়েছেন ১ লাখ ২৬ হাজার ১৮ ভোট, ব্যবধান প্রায় ৬৩ হাজার।
(২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির বিদ্যমান জেলা কমিটি বিলুপ্ত করে ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে মো. গোলাম জাকারিয়া আহ্বায়ক ও মো. রফিকুল ইসলাম (চাইনিজ রফিক) সদস্য সচিব হন। পাশাপাশি অ্যাডভোকেট মো. রফিকুল ইসলাম (টিটু), হায়াত উদ্দৌলা, কামরুল আরেফিন বুলু ও আব্দুল মতিন-কে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। পরে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের দ্বন্দ্বের জেরে জেলার পাঁচ উপজেলায় একাধিক কমিটি গঠিত হলে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতাদের মনোনয়ন দেয়া হলেও কেন্দ্রীয় নেতা কর্তৃক ঘোষিত জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দলীয় প্রার্থীদের সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। মনোনয়নবঞ্চিত অনেক নেতা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয় হননি, ফলে তাদের অনুসারী নেতাকর্মীরাও ভোটের মাঠে নিষ্প্রভ ছিলেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় কিছু প্রার্থীর মধ্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও কাজ করেছে। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থীরা একাধিকবার ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন, কিন্তু বিএনপির প্রার্থীদের প্রচারণা তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার মতো উদ্যোগও চোখে পড়েনি।
বিএনপির পরাজয়ের দায় নিয়ে জেলা কমিটিতে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম বলেন, হারুনুর রশীদ দীর্ঘদিন এলাকায় না থেকে হঠাৎ এসে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করায় ভোটাররা মুখ ফিরিয়েছে। আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়ার দাবি, হারুন তাদের সঙ্গে যোগাযোগই করেননি। এমনকি রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকতও দ্বন্দ্বের কারণে মাঠে নামেননি। তবে হারুনুর রশীদের অভিযোগ, আহ্বায়ক কমিটি চাপিয়ে দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
অন্যদিকে, জামায়াতের কৌশলগত অবস্থান এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে কাছে টানার প্রচেষ্টাও বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সাইফুল ইসলাম রেজার মতে, জামায়াত প্রায় এক বছর আগেই প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করে এবং ৫ আগস্টের পর থেকে নিরলসভাবে গণসংযোগ অব্যাহত রাখে। একই সঙ্গে জামায়াত নেতৃবৃন্দ আওয়ামী ঘরানার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ভোট নিজেদের পক্ষে টেনে আনতেও সফল হয়।
বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ধর্মীয় অনুভূতি ও ভারতবিরোধী মনোভাবকে বয়স্ক ও নারী ভোটারদের মধ্যে কৌশলে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল স্পষ্ট।
এদিকে, দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক দুর্গ হারানোর পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিএনপির ভেতরের সাংগঠনিক অনৈক্য, নেতৃত্বের অহমিকা এবং কার্যকর প্রচারণার অভাবই প্রধানভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন প্রকাশ্য। তিনটি আসনেই একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে। এতে দলের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হচ্ছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতারা নারী ও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ইসলামী সরকার গঠন ও সবার অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি প্রচার করেন। নারী কর্মীদের মাধ্যমে সাধারণ নারী ভোটারদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে তারা বেশ সফল হয়। পাশাপাশি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইসলামী জালসার আয়োজন করে জনপ্রিয় ইসলামী বক্তাদের মাধ্যমে নারী ও তরুণদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
নির্বাচন পরবর্তী চর অনুপনগর ইউনিয়ন বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের হারুনুর রশীদ বলেন, তার প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল ও তাদের দলীয় কর্মীরা নারী ভোটার দের ভোটারদের টানতে সক্ষম হয়েছেন।
উল্লেখ্য, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার তিনটি আসনেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের শুরু থেকেই মাঠে নিষ্ক্রিয় থাকা এবং মনোনীত প্রার্থীদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস শেষ পর্যন্ত দলের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাংগঠনিক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীরা মাঠপর্যায়ে সক্রিয় প্রচারণা চালায়। বিশেষ করে প্রতিটি আসনে নারী ও তরুর ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর এই ভোটব্যাংকেই কৌশলগতভাবে প্রভাব বিস্তার করে জামায়াত প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করতে সক্ষম হন।