মঙ্গলবার ● ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ● ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

শিরোনাম: আমার বাবা ভালো বাবা, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে   সব সম্প্রদায়ের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতের আহ্বান রাষ্ট্রপতির   জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন • প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন   জামায়াতের কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকা নিয়ে জাতীয় নির্বাচন করেছে এনসিপি: রাশেদ খান   বাংলাদেশকে আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিল না পাকিস্তান   তারেক রহমানের ফেনী সফর ঘিরে নিরাপত্তার ছক চূড়ান্ত   ন্যাম ভবনের বারান্দাতেও ঘুমাতে হতো মরিয়মকে: পুলিশ   
সহকারী জজ হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অনগ্রসর পরিবারের মেধাবী ছাত্র কাজল
মোঃ সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২৭ পিএম   (ভিজিট : ৬৬)

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন কাজল পাঁড়ে। কিন্তু স্বপ্নপূরণের সেই প্রথম ধাপেই সামনে আসে কঠিন বাস্তবতা—বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি দেওয়ার মতো টাকাও তাঁর হাতে ছিল না। বাবা-মা, মামা, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত ভর্তি হন তিনি।

ভর্তি হওয়ার পরও কাটেনি অর্থের সংকট। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন পরিবারকেও। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই প্রস্তুতি নিয়েছেন ভবিষ্যতের জন্য। লক্ষ্য ছিল একটাই—বিচারক হওয়া।

সেই স্বপ্ন এখন বাস্তবের খুব কাছাকাছি। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ (সহকারী জজ) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার মাধাই গ্রামের তুরি জনগোষ্ঠীর সন্তান কাজল পাঁড়ে। এ পরীক্ষায় ২০০ জনকে সিভিল জজ পদে সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কাজলের অবস্থান ১৪০তম।

কাজলের সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আনন্দে বদলে যায় মাধাই গ্রামের চিত্র। বৃহস্পতিবার রাজশাহী থেকে বাড়ি ফেরার সময় তাঁকে বরণ করতে গ্রামের শিক্ষার্থীরা ফুলের মালা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। বাড়িতে পৌঁছালে তাঁকে ফুলের মালা পরিয়ে শুভেচ্ছা জানায় তারা। এ সময় সঙ্গে ছিলেন তাঁর মা পঞ্চমী জেড়ি ও বড় বোন কল্পনা পাঁড়ে।

ভর্তি হওয়ার দিনই দেখেছিলেন বিচারক হওয়ার স্বপ্ন
২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন কাজল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ তাঁর কাছে ছিল স্বপ্নপূরণের প্রথম সিঁড়ি। কিন্তু সেই সিঁড়িতে পা রাখতেই তাঁকে পেরোতে হয় অর্থের বাধা।

ভর্তি ফি জোগাড় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও সংকট সেখানেই শেষ হয়নি। নিজের পড়াশোনা ও জীবনযাপনের খরচ চালাতে শুরু করেন টিউশনি। দিনের এক অংশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও নিজের পড়াশোনা, অন্য অংশে শিক্ষার্থীদের পড়ানো—এভাবেই চলতে থাকে তাঁর জীবন।

টিউশনি থেকে পাওয়া অর্থে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারকেও সহযোগিতা করতেন তিনি। এর মধ্যেই নিয়মিত চালিয়ে যান বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি।

কাজল পাঁড়ে বলেন, ‘২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার দিনই বিচার বিভাগের ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম।’ সেই স্বপ্নই তাঁকে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে।

ভূমিহীন কৃষক পরিবারের সন্তান
মাধাই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও দিনমজুরির সঙ্গে যুক্ত। ভূমিহীন কৃষক পরিবারের সন্তান কাজলের বেড়ে ওঠাও হয়েছে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে। উচ্চশিক্ষার পথে তাঁর যাত্রা তাই ছিল সহজ নয়।

অর্থের সংকটের কারণে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, সেখান থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে বিচার বিভাগে প্রবেশের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া—দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিতে কাজলকে নির্ভর করতে হয়েছে নিজের পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ওপর।

ফল প্রকাশের পর আনন্দে মাধাই
গত বুধবার সন্ধ্যায় ১৮তম বিজেএস পরীক্ষার ফল প্রকাশের খবর পান কাজল। এক বন্ধুর ফোনে ফল প্রকাশের বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। পরে ওয়েবসাইটে ফলাফল দেখে ২০০ জন সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পান।

নিজের অবস্থান ১৪০তম দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়েন কাজল। এরপর তাঁর সাফল্যের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মাধাই গ্রামে।

পরদিন বৃহস্পতিবার বাড়ি ফেরার সময় গ্রামের শিক্ষার্থীরা তাঁকে ফুলের মালা নিয়ে বরণ করে নেয়। পরিবারের সদস্য, স্বজন, প্রতিবেশী ও শিক্ষার্থীদের আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ।

গ্রামের মোড়ল নিরঞ্জন তিরকি বলেন, ‘কাজল আমাদের গ্রামের গর্ব। ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সে পড়াশোনা করেছে। তার সাফল্য দেখে গ্রামের অন্য ছেলে-মেয়েরাও লেখাপড়ায় উৎসাহিত হবে।’

সাফল্যের গল্প এখন অনুপ্রেরণা
কাজলের গল্প কেবল একটি চাকরিতে সুপারিশ পাওয়ার গল্প নয়। এটি এমন এক তরুণের পথচলা, যার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সামর্থ্যও একসময় ছিল না। অন্যের সহযোগিতায় ভর্তি হয়ে টিউশনি করে নিজের পড়াশোনা চালিয়েছেন, পরিবারকে সহযোগিতা করেছেন এবং একই সঙ্গে ধরে রেখেছেন বিচারক হওয়ার স্বপ্ন।

মাধাইয়ের মতো প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর এই অর্জনের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্নের পথে অবিচল থাকার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছেন কাজল।

একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি জোগাড় করাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আর আজ সেই কাজল পাঁড়ে বিচার বিভাগের সহকারী জজ হওয়ার পথে। তাঁর এই পথচলা শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়নি, নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে মাধাই গ্রামের অনেক শিক্ষার্থীকেও।

এবিষয়ে আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন একটা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তান অর্থ সংকট কে দমন করে জাতীকে দেখিয়ে দিয়েছে চরম অধ্যাবসায় দারিদ্র্যতা জয় করে কাজল দেখিয়ে দিয়েছে বিজয়ের পথে কোন বাধা অগ্রগতি মানুষের বাধা হতে পারেনা। তিনি তার সফলতার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। 

অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মোঃ মুশা বলেন দেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মোধাবী তবে তাদের মেধা কাজে লাগাতে হবে। কাজল অসাধ্য কে জয় করেছ।তার সফলতার গল্প  অন্য শিক্ষার্থীদের  অনুপ্রেরণার গল্প। কাজলের গল্পটা অনুসরণ করলে সকল শিক্ষার্থী কামিয়াব হবে বলে আমি বিশ্বাস করি,তবে এ বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে। কাজলের জন্য শুভ কামনা রইল।









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]