
মহাকাশে ভেসে বেড়ানো স্পেসএক্সের একটি পরিত্যক্ত রকেটের ওপরের ধাপ (আপার স্টেজ) আগামী বুধবার চাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে পারে। এক বছরেরও বেশি সময় আগে দুটি চন্দ্রযান উৎক্ষেপণের পর থেকে মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো এই রকেটটি অনিচ্ছাকৃতভাবে চাঁদের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়বে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রকেটটি চাঁদের পৃষ্ঠে একটি নতুন গর্ত (ক্রেটার) তৈরি করবে এবং বিপুল পরিমাণ ধুলা ও পাথরের টুকরো মহাকাশে ছিটকে যাবে। এই বিরল ঘটনাটি পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞানী ও আকাশপ্রেমীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
মহাকাশে বিভিন্ন বস্তুর গতিপথ পর্যবেক্ষণে বিশেষজ্ঞ বিল গ্রের হিসাব অনুযায়ী, রকেটটি ঘণ্টায় প্রায় ৮ হাজার ৭০০ কিলোমিটার (প্রায় ৫ হাজার ৪০০ মাইল) বেগে চাঁদের সূর্যালোকিত পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত আইনস্টাইন ক্রেটারের কাছাকাছি আঘাত করবে।
গার্ডিয়ান বলছে, ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গভীর রাতে ঘটলেও দেশটির পূর্বাঞ্চল, কানাডা এবং দক্ষিণ আমেরিকার বেশিরভাগ এলাকা থেকে এটি তুলনামূলক ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
যদিও বিজ্ঞানীরা এই নির্দিষ্ট মহাকাশ আবর্জনাটি নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন, তবে ঘটনাটি পৃথিবীর কক্ষপথে ক্রমবর্ধমান মহাকাশ আবর্জনার ঝুঁকির বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।
বিল গ্রে বলেন, মহাকাশে এখন বিভিন্ন বস্তুর ভিড় বাড়ছে। তিনি কানাডার নিউ ব্রান্সউইক থেকে সংঘর্ষ-পরবর্তী দৃশ্য পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পেসএক্সের কখনোই চাঁদে রকেটটি আঘাত করার উদ্দেশ্য ছিল না। তবে উৎক্ষেপণের পর রকেটের ওপরের ধাপটিকে সূর্যকেন্দ্রিক একটি কক্ষপথে পাঠানো হলে এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।
এটি হবে দ্বিতীয়বারের মতো কোনো পরিত্যক্ত রকেটের চাঁদে অনিচ্ছাকৃত আঘাতের ঘটনা। এর আগে ২০২২ সালে একটি চীনা রকেটের অংশ চাঁদের দূরবর্তী অংশে (ফার সাইড) আঘাত করে পাশাপাশি দুটি ক্রেটার তৈরি করেছিল। তবে এবারের সংঘর্ষটি ঘটবে চাঁদের পৃথিবীমুখী অংশে।
বিজ্ঞানীদের হিসেবে, এই আঘাতের শক্তি প্রায় তিন টন টিএনটি বিস্ফোরকের সমান হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সংঘর্ষের ফলে যে আলোর ঝলক তৈরি হবে তা এক সেকেন্ডেরও কম সময় স্থায়ী হবে এবং পৃথিবী থেকে সেটি দেখা সম্ভবত কঠিন হবে। তবে আঘাতের ফলে সৃষ্ট ধুলা ও শিলাখণ্ড কয়েক মাইল পর্যন্ত মহাকাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং কয়েক মিনিট ধরে টেলিস্কোপে দৃশ্যমান থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফার্নান্দো পেশাদার ও অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এই ঘটনা পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, চাঁদে মহাকর্ষ কম এবং সেখানে ধুলা উড়িয়ে নেয়ার মতো কোনো বাতাস নেই। এক ই-মেইল বার্তায় তিনি আরও বলেন, এই ঘটনায় আমাদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো ভবিষ্যতের মহাকাশচারীদের জন্য মহাকাশীয় ধ্বংসাবশেষের আঘাত কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা বোঝা।
ফার্নান্দোর ধারণা, সংঘর্ষে প্রায় ২৭ মিটার (প্রায় ৯০ ফুট) ব্যাস এবং ৫ মিটার (প্রায় ১৬ ফুট) গভীর একটি নতুন ক্রেটার তৈরি হবে। এটি পৃথিবী থেকে দেখা যাবে না, তবে চাঁদের কক্ষপথে থাকা মহাকাশযান সহজেই শনাক্ত করতে পারবে।
গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এই ঘটনার আগে ও পরে সংঘর্ষস্থলের ছবি তুলবে নাসার লুনার রিকনাইস্যান্স অরবিটার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দানুরি চন্দ্র অরবিটার।
এসব ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা চাঁদের পৃষ্ঠে সংঘর্ষের প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার আশা করছেন।