
লিটন কুমার দাসের চোট এখন আর কেবল একজন ক্রিকেটারের ফিটনেসের বিষয় নয়, এটি পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) মেডিকেল ব্যবস্থাপনার বড় এক প্রশ্নে! যে চোটকে শুরুতে সাধারণ কাফ মাসলের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটিই পাঁচ সপ্তাহ পরও জাতীয় দলের বাইরে রেখেছে এই ব্যাটারকে। পুরো প্রক্রিয়ায় চিকিৎসা, ভ্রমণ ও পুনর্বাসন মিলিয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান না মেলায় এবার মেডিকেল বিভাগের জবাবদিহি শুরু করেছে বিসিবি।
গত ১৪ জুন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে কাফ মাসলে চোট পান লিটন। তখন বিসিবির মেডিকেল বিভাগ জানিয়েছিল, চোট গুরুতর নয়। সেই বিশ্বাস থেকেই তাকে পরবর্তী টি-টোয়েন্টি সিরিজের দলেও রাখা হয়। কিন্তু মাঠে নামা হয়নি একটিও ম্যাচে। এরপর জিম্বাবুয়ে সফরের টেস্ট দলে জায়গা পেলেও চোট না সারায় বাদ পড়েন। পরে আবার ওয়ানডে দলে রাখা হয় এবং জানানো হয়, দ্বিতীয় ম্যাচে খেলতে পারবেন।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। জিম্বাবুয়ে গিয়েও চোট কাটিয়ে উঠতে পারেননি লিটন। শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে হয় তাকে। একই কারণে আগামী মাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দলেও রাখা হয়নি জাতীয় দলের এই ব্যাটারকে।
চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে রোগ নির্ণয় নিয়েই। রাজধানীর একটি হাসপাতালে একাধিকবার এমআরআই স্ক্যান করিয়েও কোনো নতুন সমস্যা ধরা পড়েনি। মেডিকেল বিভাগ সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পুনর্বাসন চালিয়ে যায়। কিন্তু লিটন বারবার জানিয়ে আসছিলেন, ব্যথা কমছে না। পরে তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলে নতুন স্ক্যানে পায়ে ফোলা ধরা পড়ে। যদিও সেখানে নতুন কোনো টিয়ার পাওয়া যায়নি।
লিটনের চিকিৎসা, সিঙ্গাপুরে যাওয়া-আসা, জিম্বাবুয়ে সফর এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মিলিয়ে বিসিবির প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তবে অর্থ ব্যয়ের চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল মেডিকেল বিভাগকে কড়া বার্তা দিয়েছেন। পুরো ঘটনার ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে। বিশেষ করে দেশের হাসপাতালে স্ক্যানে কিছু ধরা না পড়লেও সেই স্ক্যানের মান নিয়ে যদি মেডিকেল বিভাগেরই সংশয় থাকে, তাহলে কেন সেই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল-এমন প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দল ঘোষণার পর প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন বলেন, নির্বাচকরা মেডিকেল বিভাগের ছাড়পত্র পেয়েই লিটনকে জিম্বাবুয়ে সফরের দলে রেখেছিলেন।
একদিন আগেই তিনি বলেন, ‘লিটন প্রথম খেলল ইনজুরড হলো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডেতে, এরপর কিন্তু টি-টোয়েন্টি সিরিজেও সে দলে ছিল। তখন যে চিকিৎসা হয়েছিল যে, কাফ মাসলে ইনজুরি, কিন্তু অত বড় কিছু নয়। পরে সে যখন টি-টোয়েন্টি খেলতে পারেনি, তখন আরেকটা স্ক্যান হয়, সেখানে গ্রেড ওয়ান টিয়ার ধরা পড়ে। মেডিক্যালি এই ধরনের চোট সারতে তিন সপ্তাহের বেশি লাগার কথা নয়।’
তবে একই সঙ্গে তিনি মেডিকেল বিভাগকে সরাসরি দায়ী করতেও রাজি নন, ‘এটা আসলে মেডিকেল বিভাগের দোষ দিতে পারছি না। কারণ যখন স্ক্যানগুলি এসেছে, তখন কিন্তু স্ক্যানে তেমন কিছু ধরা পড়েনি। পরে যে স্ক্যানটা সিঙ্গাপুরে হয়েছে, সেটাতে আসলে ফোলা ধরা পড়েছে, টিয়ার নেই। এখন হয়তো সে ঠিক আছে, তবে তাকে একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসতে হবে।’
লিটনের ঘটনাই অবশ্য একমাত্র নয়। বর্তমানে নাহিদ রানা, মুস্তাফিজুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ও তানজিম হাসানও চোটের কারণে দলের বাইরে রয়েছেন। একের পর এক ইনজুরি ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিসিবির মেডিকেল বিভাগ এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একজন বোর্ড পরিচালককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তিনি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেবেন বোর্ডের কাছে!