
কক্সবাজারে আবহাওয়া পরিস্থিতি উন্নতির দিকে, বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পানিতে তলিয়ে গেছে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ জনপদ। জেলার অন্তত পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে জেলার ১০ উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নের ৫ লাখের বেশি মানুষ।
এদিকে জেলার প্রধান দুই নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে শুক্রবার ভারি বর্ষণ না থাকলেও আজ শনিবার দুপুর থেকে আবারও ভারী বর্ষণ হয়েছে। তবে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, আজ শনিবার পর্যন্ত সর্বমোট ৮ দিনে ৭৬০ মি: মি: বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৩ নং সতর্ক সংকেত নামিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। এছাড়া আগামীকাল রোববারেও ভারী বৃষ্টি হয়ে ধীরে ধীরে বৃষ্টি একেবারেই কমে যাবে। বর্তমানে আবহাওয়া পরিস্থিতি উন্নতির দিকে।
এদিকে আজ শনিবার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান পেকুয়াসহ বিভিন্ন বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি সদর ইউনিয়নের বাংলাপাড়া গ্রামের পানিবন্দি মানুষের মাঝে ত্রাণ ও ঔষধ সামগ্রী বিতরণ করেন। এসময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পেকুয়া এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি), পেকুয়া উপস্থিত ছিলেন।
কখনও রোদ কখনও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হয়েছে। আর এতে এখনো পানির নিচে রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়িসহ জেলার কয়েক লাখ মানুষ অন্যদিকে তথ্যনুযায়ী রোহিঙ্গা ও স্হানীয় মিলে চার দিনে বৃষ্টি ওবল পাহাড়ধ্বসে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার অধিকাংশ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
টানা ছয় দিনের অতি ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ, ডুবে গেছে গ্রাম, সড়ক, ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি। জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত আট লাখ মানুষ পানিবন্দি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
তবে এবারের দুর্যোগে শুধু অতিবৃষ্টি নয়, নতুন করে আলোচনায় এসেছে কক্সবাজার রেলপথ। স্থানীয়দের অভিযোগ, রেললাইন নির্মাণে পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত কালভার্ট না থাকায় অনেক স্থানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে বিল-ঝিল ও নিম্নাঞ্চলের পানি দ্রুত নদীতে নামতে পারছে না। দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থেকে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভারী বর্ষণের প্রবণতা বাড়ছে। তাই বড় অবকাঠামো নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি সমান গুরুত্ব না পেলে ভবিষ্যতে এমন দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
রামু, ঈদগাঁও, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও চকরিয়ার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, আগে বর্ষার পানি স্বাভাবিকভাবে বিল-ঝিল পেরিয়ে নদীতে যেত। কিন্তু রেললাইন নির্মাণের পর সেই স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির চাইল্যাতলীর বাসিন্দা হারুন- উর রশিদ বলেন, রেলপথ নির্মাণের সময় প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম সংখ্যক কালভার্ট করা হয়েছে। যেগুলো হয়েছে, তার অনেকগুলো সঠিক স্থানে নয়। ফলে নিচু এলাকার পানি আটকে যাচ্ছে। সেই পানি এখন সড়ক ডুবিয়ে বসতবাড়িতে ঢুকছে। অনেক পরিবারের রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় কয়েকদিন ধরে চুলা জ্বলছে না।
ঈদগাঁওয়ের কামাল হায়দার জানান, চকরিয়া থেকে কক্সবাজার সদর পর্যন্ত রেললাইন অনেক জায়গায় কার্যত বাঁধের মতো কাজ করছে। পানি চলাচলের সুবিধা বিবেচনায় আরও বেশি কালভার্ট প্রয়োজন ছিল।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জমে থাকা পানি এখন কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশও প্লাবিত করছে। রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির কাঠিরমাথা, মিঠাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকা, পানেরছড়া, চাইল্যাতলীসহ একাধিক স্থানে মহাসড়কের ওপর দিয়ে দুই ফুটেরও বেশি পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ছোট যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কেবল বাস ও মিনিবাস ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।
এছাড়া রামুর খুনিয়াপালং, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, জোয়ারিয়ানালা, রশিদ নগর, কচ্ছপিয়া, ফতেখারকুল, চাকমারকুল, উখিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম, কক্সবাজার সদরের পিএমখালী, বাংলাবাজার, খরুলিয়া, গোদারপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা বুক সমান পানিতে ডুবে আছে। একই অবস্থা ঈদগাঁওর জালালাবাদ, পোকখালী, ইসলামাবাদ, ভোমরিয়াঘোনা, দরগাহপাড়া, মাইজপাড়ায়। এসব এলাকায় জমা পানি রেলপথের জন্য দ্রুত নিষ্কাশনে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে চিরিংগা সেতু পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, চিরিংগা পয়েন্টে মাতামুহুরী নদীর বিপৎসীমা ধরা হয় ৫ দশমিক ৮ মিটার। সকাল ৯টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ৬ দশমিক ২৯ মিটার। মাতামুহুরীর উজানে বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। তিনি আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান।
কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। ৬৪০টি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ১৪ হাজার ৬১ জন। সরকারি ভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার নগদ টাকা।