
ঢাকা মেডিকেল কলেজ বিশ-পঁচিশ বছর পরে ‘দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা কেন্দ্র হবে’, এমন প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ জুবাইদা রহমান।
শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে তিনি বলেন, “আগামী ২০ বা ২৫ বছর পরে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাই।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী চিকিৎসক জুবাইদা রহমান বলেন, “ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আগামী অধ্যায়টি শুধু অতীতের গৌরবের ধারাবাহিকতা নয়, এটি হবে নতুন উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণায় উৎকর্ষ এবং মানবিক নেতৃত্বের এক নতুন অধ্যায়।”
“আজ আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছি। কর্মক্ষেত্র ভিন্ন কিন্তু আমাদের পরিচয়ের শিকড় এখনো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হসপিটাল।”
তিনি বলেন, “আমরা চাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হোক একটি ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স অ্যান্ড কমপ্যাশন ফর পেশেন্টস। একটি আশ্বস্ত করার বাক্য একটি ওষুধের মত কাজ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভিত্তি জ্ঞান হলেও চিকিৎসা পেশার প্রকৃত ভিত্তি মানবিকতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যতই প্রযুক্তি নির্ভর হোক না কেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় মানুষই থাকে।”
প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী বলেন, “এখন সময় এসেছে, অ্যালামনাইকে শুধু স্মৃতির বন্ধনে নয়, দায়িত্বের বন্ধনে যুক্ত থাকতে হবে। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার অবকাঠামোতে, তার মানুষের মধ্যে।
“ঢাকা মেডিকেল কলেজের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মেধা, তার মূল্যবোধ এবং তার মানসিকতার মধ্যে। প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহযোগিতা সম্পদ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিটি সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একজন মানুষ, একটি পরিবার, জীবন।”
‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ ডে’ উপলক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ ডা. শামসুল আলম খান মিলন মিলনায়তনে আলোচনা পর্বের আয়োজন করে।
প্রধানন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান কলেজের ৪৩তম ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে তার আগমনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে গাড়ি চালিয়ে জুবাইদা রহমানকে নিয়ে মেডিকেল কলেজে আসেন। প্রথমে বেলুন উড়িয়ে ঢাকা ‘মেডিকেল কলেজ ডে’ উদ্বোধন করেন তিনি।
এরপর প্রধানমন্ত্রী তার সহধর্মিণীকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীদের কাজী ফজলুল হক মহিলা হোস্টেলে। এই হোস্টেলে থাকতেন জুবাইদা রহমান। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তারা।
১৯৪৬ সালের এদিনে ১০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে প্রথম দুই ঘন্টা ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাবনা’ শীর্ষক মতিবিনিময় সভা হয়। এতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরা তাদের ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিল্পীর আঁকা আলোকচিত্র উপহার দেওয়া হয়।
আলোচনা সভার মূল অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে দুই ছাত্রী হলের চলমান প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী অবহিত হন।
পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান ক্যাম্পাসে দুই গাছের চারা রোপন করেন।
বক্তব্যের শুরুতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জুবাইদা রহমান।
চিকিৎসক জুবাইদা রহমান বলেন, “বহুদিন ধরে একটি আর্তনাদ আমার কানে ধ্বনিত হয়, সেই আর্তনাদ একজন রোগীর পরিবারের সদস্যের। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের সুষ্ঠু ডায়াগনসিসে ব্যর্থ আমাদের ওয়ার্ডের সকলে। কারণ সিটি স্ক্যান মেশিন সেদিন অকেজ ছিল।
“শত প্রচেষ্টার পরও সেই ব্যক্তিকে বাঁচানো যায়নি। ‘থার্ড ইয়ার, ফোর্থ ইয়ার, ফিফথ ইয়ারে পরবর্তীতে ইন্টার্নিশিপের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনেক সময় দেখেছি উপলব্ধি করেছি সেই অসহায়ত্ব।”
শিশু ওয়ার্ডের দুই চোখ অন্ধ এক রোগীর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “সে কেমন করে যেন বুঝতে পারত, আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তাকেও হারাই অপারেশনের টেবিলে। অথবা অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত একজন গৃহকর্মী যে যন্ত্রণায় চিৎকার করত।
“গাইনোকলজি অ্যান্ড অবেস্টেটিকস রোটেশনের সময় সেই দিনের কথা প্রায় মনে পড়ে, যখন আল্ট্রাসনোগ্রামে অষ্টম কন্যা শিশু হবে জানায় স্ত্রীকে একাকী ওয়ার্ডে রেখে যায় তার স্বামী। শিশুটি জন্ম নেওয়ার পর দেখা যায় সেটি পুত্র সন্তান। কিন্তু শ্বাস নিতে দেরি নিয়ে মুহ্যমান অসহায় স্বামী, তার অসহায়ত্ব হয়ত বোঝা যায়।”
পরে শিশুটি বেঁচে যাওয়ায় পরিবারটি স্বস্তি পায়, বলেন জুবাইদা রহমান।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মুসররাত সুলতানার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী এমএন মুহিত ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. মাজহারুল শাহীন।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহের উর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী এসএম জিয়া হায়দার, স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশিদ, বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক নাজমুল হাসান।