
মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিবাহ হচ্ছে সবচেয়ে পুরাতন প্রতিষ্ঠান, সভ্য সমাজের ভিত্তি। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (স:) এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ মানুষের জন্য বিধিবদ্ধ নিয়ম-কানুন প্রণয়ন ও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। বিয়ে-শাদী নর-নারীর মাঝে পবিত্র বন্ধন ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থা ফলে সুস্থ, সংহত এবং শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-যাপন করার নিশ্চয়তা লাভ করে সমাজ।
ইসলামী দিক দর্শন ও নীতিমালায় যৌতুক লেন-দেন শরীয়তের ঘোর বিরোধী। বর-পণ দেয়ার কোন অস্তিত্ব নেই পবিত্র কুরআন হাদীসে। যৌতুক বাংলা শব্দ, প্রতিশব্দ পণ। দুটোই সংস্কৃত থেকে এসেছে। হিন্দিতে- দহীজ, ইংরেজীতে- উড়ৎিু, আরবিতে- বায়িনাতুন, দুত্বাতুন মাহরুন প্রভৃতি। ‘যৌতুক হল বিবাহ উপলক্ষে কন্যা বা কন্যার পরিবারের পক্ষ থেকে বরকে প্রদেয় সম্পদ’। (এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা)।
আর বাংলা পিডিয়ায় বলা হয়েছে- ‘বিবাহের চুক্তি অনুসারে কন্যাপক্ষ বরপক্ষকে বা বরপক্ষ কন্যাপক্ষকে যে সম্পত্তি বা অর্থ দেয় তাকে যৌতুক বা পণ বলে।’ যৌতুকের মত অশুভ জঘন্যতম প্রথাটি বাঙালী সমাজের অতি পুরনো সংস্কার। এক সময় বাঙালী মুসলিম সমাজে বিশ শতকের আগে বরপক্ষের দাবী ও বধু নির্যাতনের ঘাতকরূপে যৌতুক অথবা বরপণের অস্তিত্ব ছিলোনা। মূলত: হিন্দুদের সংস্কৃতি থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে। পৃথিবীর আর কোন মুসলিম সমাজে এ ধরনের যৌতুক প্রথার প্রচলন নেই।
ইসলামী দর্শন মতে- বিবাহে কোন পক্ষই আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূলের (স:) দাবী সমূহ ব্যতিরেকে অন্য কোনরূপ দাবী-দাওয়া করতে পারবে না। একজন মুসলমান তার সীমা-রেখার মধ্যে জীবন ধারা পরিচালনা করবে। জোরপূর্বক অন্যায্য দাবী আদায় করার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর শাস্তি নির্ধারিত। ইরশাদ হচ্ছে “আর যে কেউ সীমা লংঘন করে অন্যায্যভাবে তা করবে তাকে অগ্নিতে দগ্ধ করা হবে, এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।” (সূরা নিসা-৩০)। ইসলামী বিধান ও সংস্কৃতিতে বরকে উপটৌকন দেয়ার অনুমোদন নেই। কন্যার জীবনধারা দুটো ভাগে দু’জনের দায়িত্বে অর্পিত। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- “বিবাহের পূর্ব পূর্ব পর্যন্ত পিতার উপর মেয়ের ভরণপোষনের দায়িত্ব।” (বাকারা-২৩৩)। আর বিয়ের সময় হতে আজীবন স্ত্রীর ভরন-পোষনের দায়িত্ব স্বামীর উপর। বিয়ের সময় স্ত্রীকে দেন-মোহর তথা উপটৌকন দেয়ার দায়িত্বও স্বামীর। কেননা মহান আল্লাহ্র বানী- “পুরুষগণ স্ত্রীলোকদের উপর অভিভাবক, কেননা আল্লাহ তাদের কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং এই কারণেও যে, তারা নিজেদের ধন-সম্পদ থেকে স্ত্রী-লোকদের জন্য খরচ করে।” (সূরা নিসা-৩৪)।
যৌতুক মূলত: অর্থনৈতিক লেন-দেন কেন্দ্রিক, এ ব্যাপারে ইসলামের নীতিমালা হলো- তা অবৈধভাবে বা অনির্ধারিত পথে অর্জন করা চলবে না। অথনৈতিক লেন-দেনের মৌলিক বিধান সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন- “তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করিও না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিয়দংশ জানিয়া শুনিয়া অন্যায়ভাবে গ্রাস করিবার উদ্দেশ্যে উহা বিচারকদের নিকট পেশ করিও না।” (সূরা বাকারা-১৮৮) অন্য এক আয়াতে আছে- “হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করিওনা।” (সূরা নিসা-২৯)। অর্থাৎ যা তোমার নয় তা দাবী করা যাবে না, এটা অন্যায়। বরপক্ষ হতে কন্যাপক্ষের নিকট অর্থ-সম্পদের দাবী নামা পেশ করে তা দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে যৌতুক নামীয় গরল আদায় করা হয়।
ইসলামের নীতিবোধ এ কথাই বলে, কোন মুসলমানের মাল তার অন্তরের আন্তরিক সম্মতি ব্যতীত হস্তগত করলে তা হালাল হবে না। বুযুর্গরা যৌতুক কে ডাকাতির নামান্তর বলে অভিহিত করেছেন। সুতরাং এটা কাবীরা গুনাহ বিশেষ। শরীয়তে বিবাহের লেন-দেন সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, স্বামী স্ত্রীকে মোহর বাবদ কিছু সম্পদ দিবে। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের নিদের্শনা হলো- “আর তোমরা নারীদেরকে তাহাদের মোহর স্বত:প্রবৃত্ত হইয়া প্রদান করিবে।” (সূরা নিসা-৪)। কনের প্রাপ্য দেন মোহর কোন দয়ার দান নয় বরং তা তাদের অধিকার। তাই স্বত:স্ফূর্তভাবে দেন মোহর পরিশোধ করা মুসলমানদের কর্তব্য। সূরা নিসার ২৫ নং আয়াতে তা ন্যায়সংগতভাবে প্রদান করা নির্দেশ করেছেন মহান আল্লাহ। সুতরাং শরীয়তের দৃষ্টিতে মোহর প্রদান স্বামীর অন্যতম দায়িত্ব এবং তা স্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ অধিকার যা অফেরৎ যোগ্য। এ ক্ষেত্রে ইরশাদ হচ্ছে- “তোমরা যদি এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্রহণের সংকল্প কর এবং তাহাদের একজনকে অগাধ অর্থ দিয়া থাক তবুও উহা হইতে কিছুই প্রতি গ্রহণ করিওনা।” (সূরা নিসা-৪)।
মূলত: বিবাহ হলো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে অন্যের কাছে উপকৃত ও পরিতৃপ্ত হওয়ার মাধ্যম। কিন্তু স্বামীর অধিকার বেশি। তাই স্ত্রীর কর্তব্য অধিক। স্ত্রী তার দেহ-যৌবন সমর্পণ করে বিবাহোত্তর কালে। নির্ধারিত মোহর প্রদান করে স্বামী তার স্ত্রীকে উপভোগ করবে। আর মহানবী (স:) এর যামানার রেওয়াজ অনুযায়ী সদ্য বিবাহ শেষে বরপক্ষ তার নতুন আত্মীয়দেরকে অলীমা (বৌ-ভাত) খাওয়াবে। বিবাহের ক্ষেত্রে এ দু’টিই খরচ প্রণিধানযোগ্য আর তা ছেলের পক্ষ থেকে হতে হবে। আর স্ত্রীর ভরনপোষণ তো আছেই। তবে শ্বশুর বাড়ীর পক্ষ থেকে পিতার সামার্থনুযায়ী মেয়ের সংসারের জন্য বা জামাই’র জন্য যৎসামান্য উপহার প্রদান করাতে দোষ নেই। কারণ প্রিয় নবী (স:) তার মেয়ে হযরত ফাতিমা (রা:) এর বিয়েতে মেয়ের সংসারের জন্য একটি জাঁতা উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। অন্য বর্ণনায় আছে- যৌতুক হিসেবে তিনি (স:) হযরত ফাতিমাকে একটি পশম-নির্মিত সাদা রঙ্গের চাদর, একটি ইযখির ঘাস-নির্মিত বালিশ এবং চর্ম নির্মিত পানির মশক দিয়েছিলেন। (আবু দাউদ, ইবনে মাযা)। অবশ্য বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে উপহারের পরিমাণ সামর্থানুযায়ী স্বেচ্ছায় হতে হবে। আমাদের সমাজে প্রচলিত বিবাহের অনুষ্ঠানাদি ও প্রতিযোগিতামূলক উপঢৌকন প্রদান ও প্রদর্শন মূলত: রিয়া বা লোকদেখানো ও অহংকার প্রকাশের মাধ্যম বৈ অন্য কিছু না। এ ধরনের অপচয় তথা অপব্যয় ইসলাম অনুমোদন করে না। হযরত আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (স:) বলেন- “সর্বাপেক্ষা বরকতময় হলো ঔ বিবাহ যা কম খরচে নির্বাহ করা হয়।” (বায়হাকি)।
বর্তমানে প্রচলিত যৌতুক নামক জঘন্য অপকর্মটি নিঃসন্দেহে আল্লাহর গজব বিশেষ। মূলত: সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এটা বিস্তৃত। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮০ সালে যৌতুক বিরোধী আইন পাশ করেছে। যা দন্ডবিধির আওতাভূক্ত অপরাধ বটে। নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ অভিশপ্ত যৌতুক। যৌতুকের অর্থ-সম্পদ দাবী করা ইসলামের দৃষ্টিতে পরিষ্কার অবৈধ বা হারাম। নির্ঘাত ইসলামি বিধানের বিরুদ্ধাচারণ।
লেখক- মুতাওয়াল্লী, খানকায়ে হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর (রহ.) ঢাকা