
গুম, জালিয়াতি ও বিতর্কিত দলিলের মাধ্যমে গুলশানের একটি বাড়ি দখলের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে চলা আলোচিত মামলায় মূল মালিকের পক্ষে রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রায়ে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নামে সম্পত্তির রেজিস্ট্রি এবং পরবর্তী সব হস্তান্তর ও নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ রায়ের ফলে প্রকৃত মালিকের কাছে সম্পত্তি ফিরে যাওয়ার পথ সুগম হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) প্রধান বিচারপতি জোবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ রায় দেন। আদালতে বাদীপক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম।
মামলার বিবরণে বলা হয়, গুলশানের সিডব্লিউএন (নর্থ) ব্লকের ৩৬ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর বাড়িটি বন্ধক রেখে এআরএ জুট ট্রেডিং করপোরেশন অগ্রণী ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা ঋণ নেয়। পরে ঋণ খেলাপি হওয়ায় ব্যাংক সম্পত্তিটি বিক্রির উদ্যোগ নেয়।
এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাসঙ্গিক সার্কুলার অনুযায়ী মূল ঋণের তিনগুণ অর্থ, কস্ট অব ফান্ডসহ ব্যাংকের সব পাওনা পরিশোধ করে বন্ধকী সম্পত্তি ছাড়িয়ে নেওয়ার আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও সেই আবেদন অনুমোদন করে। কিন্তু পরে একটি ভুয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) তৈরি করে নজরুল ইসলাম মজুমদার ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী প্রায় ১৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেন এবং অগ্রণী ব্যাংক তার নামে সম্পত্তির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করে।
এ ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের হয়। পরে বিষয়টি আপিল বিভাগে গড়ায়।
মামলার নথি অনুযায়ী, আপিল বিভাগে বিচারাধীন অবস্থায় বিগত সরকারের আমলে এআরএ জুট ট্রেডিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল কবির খানকে গুম করে কথিত ‘আয়নাঘরে’ নেওয়া হয়। সেখানে তাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে চলমান মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার আইনজীবী সিনিয়র অ্যাডভোকেট ফিদা এম. কামালকেও বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গোয়েন্দা সংস্থার সাদা পোশাকের সদস্যরা অস্ত্রের মুখে তাকে আদালতে নিয়ে গিয়ে মামলা প্রত্যাহার করান। নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আনোয়ারুল কবির খান মামলা প্রত্যাহার করেন এবং দেশত্যাগ করেন।
২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে ফিরে তিনি গুম কমিশনে অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে জোরপূর্বক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ করে আপিল বিভাগে রিভিউ আবেদন করেন। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে পুনরায় শুনানির নির্দেশ দেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আপিল বিভাগ তার আপিল মঞ্জুর করে এ রায় দেন।
বাদীপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘মিথ্যা তথ্য, জাল দলিল, ভুয়া এমওইউ এবং গুমের মাধ্যমে সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সম্পত্তিটি দখলে নেওয়া হয়েছিল। আদালতে উপস্থাপিত ইমিগ্রেশন রেকর্ডে দেখা যায়, যাদের সঙ্গে এমওইউ করার দাবি করা হয়েছে, তাদের কয়েকজন ওই সময় দেশেই ছিলেন না। ফলে সংশ্লিষ্ট নথিতে স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।’
তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগ সব তথ্য-প্রমাণ, নথি ও আইনি দিক পর্যালোচনা করে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে পরবর্তী সব হস্তান্তরও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এ রায়ের ফলে প্রকৃত মালিক তার সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো আইনি বাধা রইল না।’
আহসানুল করিমের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলার রায়ের মাধ্যমে জালিয়াতি, জবরদস্তি ও কথিত গুমের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে একজন বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে। সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে এ রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।