মঙ্গলবার ২১ জুলাই ২০২৬ ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

শিরোনাম: স্পেনের বিশ্বকাপ জয় যেন মার্কিন-ইসরাইলবিরোধীদের উৎসব: ইরান   ভারী বৃষ্টি নিয়ে নতুন বার্তা দিল আবহাওয়া অফিস   বাধ্যতামূলক অবসরে গেলেন অতিরিক্ত ডিআইজি   মিত্রদের ধন্যবাদ জানালেন প্রধানমন্ত্রী, ৩১ দফা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার   বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে দেশে ফিরল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন    ফের জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় রাজধানীবাসী   অনিয়মের অভিযোগে ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল   
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের বিভিন্ন রুট দিয়ে ঢুকছে নেশাজাতীয় সিরাপ ও ট্যাবলেটের চোরাচালান
ঝুঁকছে তরুণ প্রজন্ম, সীমান্তে বিজিবির তৎপরতা বৃদ্ধি
মোঃ সাজেদুল হক সাজু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ৪:২২ পিএম   (ভিজিট : ১৪৭)

সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে বদলে গেছে মাদক চোরাচালানের চিত্র। একসময় ফেনসিডিল ও ইয়াবাকেন্দ্রিক চোরাচালান বেশি থাকলেও বর্তমানে  আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র প্রেসক্রিপশন ওষুধের আড়ালে দেশে প্রবেশ করাচ্ছে নতুন ধরনের নেশাজাতীয় সিরাপ ও উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক ট্যাবলেট। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরায় বেশির ভাগ ধরা পড়লেও শক্তিশালী  মাদক সিন্ডিকেট নানামুখী রুট ব্যাবহার করে তাদের চিহ্নিত   মাদক গন্তব্য স্থানে চলে যাচ্ছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী রাজশাহীর বিভিন্ন সীমান্তের অন্তত ২৭টি সক্রিয় রুট ব্যবহার করে এস্কাফ, ফেয়ারডিল, চকোপ্লাস সিরাপ এবং ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট নিয়মিত দেশে ঢুকছে। পরে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব মাদক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র যানায় , সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযানের কারণে প্রচলিত মাদক পাচার আগের মতো সহজ নয়। তাই চোরাচালানকারীরা কৌশল পরিবর্তন করে এখন প্রেসক্রিপশন ড্রাগ বা ওষুধের আড়ালে নেশাজাতীয় দ্রব্য দেশে আনছে। এমন  পরিস্থিতিতে  প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট সীমান্ত’ গড়ে তোলার দাবি করেছে সচেতন মহল।
ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা এস্কাফ, ফেয়ারডিল ও চকোপ্লাস সিরাপে উচ্চমাত্রার কোডিন ফসফেট থাকায় এগুলোর নেশার তীব্রতা নিষিদ্ধ ফেনসিডিলের সমপর্যায়ের। অন্যদিকে ট্যাপেন্টাডল মূলত তীব্র ব্যথানাশক ওষুধ হলেও মাদকসেবীরা এটিকে তীব্র নেশা ও হ্যালুসিনেশন তৈরির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলক কম দামের কারণে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এসব মাদকের ব্যবহার বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

কয়েকজন চিকিৎসক জানান চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ দীর্ঘদিন সেবনের ফলে লিভার ও কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধিমত্তা, বিচারক্ষমতা ও কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। দীর্ঘমেয়াদে আসক্তরা পরিবার ও সমাজের জন্য বড় বোঝায় পরিণত হয়।

অনুসন্ধান বলছে , চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর বিস্তীর্ণ সীমান্তের অন্তত ২৭টি রুট ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে এসব ক্ষতিকর সিরাপ ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট। মাদক কারবারিরা কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত, ইউনিয়নভিত্তিক অরক্ষিত পয়েন্ট এবং গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা ব্যবহার করে চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত অতিক্রমের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে একাধিকবার ক্যারিয়ার পরিবর্তন বা ‘হাতবদল’ করা হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে দায়িত্ব পালন করছে বিজিবির তিনটি ব্যাটালিয়ন। এর মধ্যে ৫৯ বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ১৬টি, ৫৩ বিজিবির আওতায় ৮টি এবং ১৬ বিজিবির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ৩টি সক্রিয় মাদক প্রবেশ রুট রয়েছে। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা লাগা রাজশাহীর গোদাগাড়ী সীমান্ত দিয়েও নিয়মিত মাদক দেশে প্রবেশ করছে।  বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জব্দ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। 

অনুসন্ধানের  তথ্য অনুযায়ী, সদর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর ও দুর্লভপুর, আলাতুলি ইউনিয়নের কোদালকাটি ও বকচর এবং চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখের আলী সীমান্ত  মাদক চোরাচালানের অন্যতম  রুট হিসেবে পরিচিত এবং এসব এলাকায় রয়েছে প্রভাবশালী মাদক সাম্রাজ্যের রথী ও মহারথীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকহন শুধু বহনকারীগন।

এছাড়া শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের কিরণগঞ্জ, কালীগঞ্জ ও জমিনপুর; শাহবাজপুর ইউনিয়নের শ্মশানঘাট, আজমতপুর ও উনিশবিঘী; মনাকষা ইউনিয়নের শিংনগর; দুর্লভপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর; পাঁকা ইউনিয়নের ওয়াহেদপুর ও তেলকুপি; চকপাড়া, শিয়ালমারা এবং দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের সোনামসজিদ-বালিয়াদিঘী সীমান্ত দিয়েও নিয়মিত মাদকের চালান প্রবেশ করছে।

এদিকে  ভোলাহাট উপজেলার চামুসা, হোসেনভিটা, গিলাবাড়ী, বিলভাতিয়া, গোহালবাড়ী ইউনিয়নের আলী সাহপুর, দলদলি ইউনিয়নের পোল্লাডাঙ্গা-ময়ামারি এবং গোমস্তাপুর উপজেলার রোকনপুর ও বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের শিবরামপুর সীমান্তকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাচালানকারীরা।

মাদকের এই নতুন প্রবণতা ঠেকাতে সীমান্তে জোরালো অভিযান পরিচালনা করছে বিজিবি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৫৯ বিজিবি উদ্ধার করেছে প্রায়  ১৩ হাজার  ফেনসিডিলের বিকল্প নেশাজাতীয় সিরাপ এবং ৫১ হাজার ৭৭৪ পিস বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট।

অন্যদিকে, ৫৩ বিজিবি জুন ও জুলাই মাসে এক আসামিসহ প্রায় দু হাজার  এস্কাফ সিরাপ, ১৮৭ বোতল ফেয়ারডিল সিরাপ এবং ৪০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে। একই সময়ে ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়ন একাধিক অভিযানে এস্কাফ সিরাপের পাশাপাশি রেকর্ড ৩০ হাজার ৭০০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে। পরে জব্দ করা সব মাদক আইনগত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের  উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের আচরণ ও পড়াশোনায় নীরব অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে অভিভাবকেরা গাঁজা, ফেনসিডিল বা ইয়াবা নিয়ে সতর্ক থাকলেও এখন নেশাজাতীয় সিরাপের আড়ালে অনেক শিক্ষার্থী মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে। অনেক পরিবার বুঝতেই পারছে না কখন তাদের সন্তান অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম মেধা ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়বে।

সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মনির বলেন, মাদক সিন্ডিকেটগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বারবার রুট ও মাদকের ধরন পরিবর্তন করছে। শুধু সীমান্তে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মাদক চোরাচালানের পেছনে থাকা মূল গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে বিজিবি সর্বদা তৎপর রয়েছে। পাশাপাশি যুবসমাজ ও সীমান্তবর্তী অন্চলের সাধারণ মানুষ কে সচেতনসহ এর কুফল সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। 

৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এক প্রশ্নের উত্তরে জানান চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তের কাছাকাছি বাড়িঘর  থাকা এবং সেই সব মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় তারা সহজেই বহনকারী হিসেবে লিপিবদ্ধ করে থাকেন।

১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, সীমান্তে মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং যেকোনো মূল্যে সীমান্তকে নিরাপদ রাখতে বিজিবির অভিযান অব্যাহত থাকবে।

তিনি আরও বলেন  দেশের  সার্থে যুবসমাজ কে মাদকের এই ভয়াবহ আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে সকল কে এগিয়ে আসতে হবে।









  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ


সম্পাদক ও প্রকাশক: ড. কাজী এরতেজা হাসান
সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
সাউথ ওয়েস্টার্ন মিডিয়া গ্রুপ


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম


©ডেইলি ভোরের পাতা ডটকম

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫।
ফোন:৮৮-০২-৪১০১০০৮৭, ৪১০১০০৮৬, বিজ্ঞাপন বিভাগ: ৪১০১০০৮৪, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৪১০১০০৮৫
অনলাইন ইমেইল: [email protected] বার্তা ইমেইল:[email protected] বিজ্ঞাপন ইমেইল:[email protected]