
প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী ১৩ জুন (শনিবার) সরকারি সফরে কক্সবাজারে আসছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর পর্যটন জেলাটিতে এটিই তাঁর প্রথম সফর, যা ঘিরে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। এ সফরকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তবে তোরণ,গেইট,পোস্টার না সাঁটাতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে বাস্তবায়ন করতে উচ্চপদস্থ কর্মর্কতাদের সমন্বয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় উচ্চ পর্যায়ে প্রস্তুতি সভা সম্পন্ন করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। এছাড়া জেলাজুড়ে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করেছে সর্বস্তরের প্রশাসন। চলছে বিভিন্ন স্পটে প্রশাসন এর মহড়া ও তাল্লাশি। এছাড়া সড়ক থেকে শুরু করে সরকারি বিভিন্ন স্থাপনায়-ও চলছে সাজসজ্জার কাজ।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার সফর ঘিরে প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে অনেক জনদাবী উঠেছে। বিশেষ করে, ‘ভয়েস অব কক্সবাজার ভলান্টিয়ার্স’ এ সফরকে ঘিরে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছে, যেগুলোকে তারা জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রয়োজন ও প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছে। এছাড়া “আমরা কক্সবাজারবাসী”নাগরীক আন্দোলনসহ অনেকেই বিভিন্ন দাবী তুলেছে।
“আমরা কক্সবাজারবাসী” সংগঠন এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন, নাগরিক আন্দোলন এর সাধারণ সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাসসহ সুশিল সমাজের নেতৃবৃন্দ জানান, কক্সবাজারকে বিশ্বমানের পর্যটন গড়ে তুলতে এবং ১২০ কি:মি: সমুদ্র সৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) আইন বাস্তবায়ন দরকার।
এছাড়া সৈকতে ইসিএ আইন উপেক্ষা করে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা, সমুদ্র সৈকতকে দখলমুক্ত করা, মেরিন ড্রাইভ এর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্যকর করা, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প ৬লেইন-এ উন্নিতিকরণ এর কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা, পৌরশহরে তীব্র সুপেয় পানির সংকট নিরসন করা, সদর হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস ও পূর্ণাঙ্গ আইসিও স্থাপন করা, দীর্ঘ দিন থেকে পড়ে থাকা কক্সবাজার মেডিকেল কলেজটি দ্রুত সময়ের মধ্যেই চালু করা এবং পৌরসভার মধ্যে নতুন ও পুরাতন রোহিঙ্গ সনাক্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করা, এবংশহরজুড়ে পৌর টুল ও কাস কালেকশন আদায় এর নামে বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহন থেকে চাঁদাবাজী বন্ধ করার দাবী জনান প্রধান মন্ত্রীর কাছে।
এদিকে সরাজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিশেষ করে, শহরের বাসটার্মিনাল উভয় পাশে সড়কের ওপর চলন্ত গাড়ি থামিয়ে রাতদিন সর্বস্তরের যানবাহন থেকে টাকা আদায় করছে একটি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। তথ্যসূত্রে, তাঁরা সরকার দলীয় রাজনৈতিক দল এর নাম ভাঙ্গিয়ে ও পৌরসভার কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার পরোক্ষ সহযোগীতায় এই চাঁদা আদায় করছে। এছাড়া এভাবেই প্রতিদিন চাঁদা আদায় করছে, শহরের খুরুশকূল পুরনো লোহার ব্রীজ এর সামনে, বাজারঘাটার আইভিপি সড়ক, ভোলা বাবুর পেট্রোল পাম্প, বদর মোকাম সড়ক, কলাতলিসহ শহরতলির সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে থেকে। এছাড়া জেলার অন্যান্য উপজেলা ও পৌরশহরের সড়ক অবস্থা-ও একই। এসব চাঁদা আদায়ের বিরুদ্ধে কোন গণমাধ্যম কর্মী সংবাদ পরিবেশন করতে গেলে, চাঁদাবাজদের হাতে হেনস্তা ও হুমকি-ধমকির শিকার হতে হচ্ছে প্রায়শই।
এদিকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে বর্তমান বিএনপি সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সরকার ও দলের হাইকমান্ড থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, চাঁদাবাজি, মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকান্ডে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা তদবিরে ছাড় দেওয়া হবে না। সেই জিরো ট্রলারেন্স নীতিতে এসব চাঁবাজি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা চাই স্থানীয়রা।
আমরা কক্সবাজার সংগঠন এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলেন আর-ও বলেন,“কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে সরকারি ও প্রশাসনিকভাবে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধানের অভাবে সৈকতটি বারবার দখল হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এর পর নিয়মিত নজরদারির অভাবে ও পর্যটন কেন্দ্রিক অসাধু চক্র বারবার কৈকত এর বালিয়াড়ি ও ঝাউবন দখল করে পুরো সৈকতকে বস্তিতে পরিণত করেছে। এছাড়া ও প্রশাসন এর কিছু অসাধু কর্মকর্তার ও সরকার দলীয় রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছার অভাবে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র ও পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকতটি বিশৃংঙ্খলা ও অবহেলায় পড়ে আছে।
কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান জানান, “দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যবাসন চাই তাঁরা। যেহেতু এই প্রত্যাবাসন একটি জটিল ও বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সমস্য। তাই আপতত নিরাপত্তা জনিত কারণে তাদের গতিবিধি লক্ষ করা উচিত। এছাড়া ইউনিয়ন থেকে শুরু করে পুরো জেলায় তাদের অবস্থান কোথায় কোথায় তা- একটি তালিকা তৈরী করা দরকার। কারণ নতুন ও পুরনো রোহিঙ্গরা ককস্বাজার জেলায় ছড়িছিটিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া কক্সবাজার যতো অপরাধমূলক কর্মকান্ড সংঘটিত হচ্ছে সিংহভাগ রোহিঙ্গারা জড়িত। যেমন, ঘুম-খুন, মাদক ও অস্ত্রের চালনাসহ বিভিন্ন অপরাধ। তাই আমাদের দাবী দ্রুত নতুন ও পুরনো রোহিঙ্গা তালিকা করে তাদের আইডি কার্ড বাতিল এর দাবী জানাচ্ছি”
প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার ১ মোহাম্মদ উজ্জ্বল হোসেন স্বাক্ষরিত সূচি মতে প্রধানমন্ত্রী ১৩ জুন (শনিবার) সকাল ১০ টায় আকাশপথে কক্সবাজার পৌঁছাবেন। রাত ১০ টায় আকাশপথে ঢাকায় ফিরবেন।
দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কক্সবাজার সদরের পিএমখালীতে পাতলীখাল পুনঃখনন উদ্বোধন করবেন। সাড়ে ১০ টায় ওখানে এক পথসভায় বক্তব্য দেবেন। এই খালটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খনন শুরু করেছিলেন। ওখান থেকে প্রধানমন্ত্রী যাবেন চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে। যেখানে বেলা ১২টায় ‘সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি’র উদ্বোধন পরবর্তী ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক ঘুরে দেখবেন।
এরপর তিনি পেকুয়া উপজেলায় ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শহীদ মো. ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করবেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
দুপুর দেড়টায় নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও মোনাজাতে অংশ নেবেন। এরপর পেকুয়ায় গিয়ে পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানেও যোগ দেবেন। ওখানে জোহরের নামাজ আদায় ও মধ্যাহ্নভোজ শেষে চকরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন তিনি।
বিকেল ৪টায় চকরিয়া পৌরসভা এলাকায় আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী। জনসভা শেষে সন্ধ্যা ৬টায় তিনি মেরিন ড্রাইভ সড়ক ও সমুদ্রসৈকত পরিদর্শন করবেন।
সফরের শেষ পর্যায়ে রাত ৮ টায় কক্সবাজারের কলাতলীস্থ লং বিচ হোটেলে স্থানীয় সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ বেবেন।
উল্লেখ্য-যে, এর আগে ১৯৮৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে প্রথমবার কক্সবাজারে আসেন তিনি। এরপর ১৯৯৭ সালে দু’দিন পারিবারিক সফরে কক্সবাজারে অবস্থান করেছিলেন। সে সময় তিনি হোটেল শৈবালে রাত্রি যাপন করেন। এর পর তিনি দলীয় প্রোগ্রামে বেশ কয়েকবার কক্সবাজারে আসেন।