ঝিকরগাছার গঙ্গানন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ

ঝিকরগাছার গঙ্গানন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির উপর বেআইনিভাবে গড়ে ওঠা ২১৪টি পাকাদোকানপাট-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘিরে প্রধান শিক্ষকসহ কথিত ভাড়াটিয়াদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি,অনিয়ম,অব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাচারীতার গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।কাগজে কলমে বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন অথচ অনিয়ম ব্যবস্থাপনার ফলে এসব সম্পত্তির মালিকানা হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম ঘটেছে। বিদ্যালয়ের ভূমি উন্নয়ন কর বকেয়া পড়েছে লক্ষাধিক টাকা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গঙ্গানন্দপুর-ছুটিপুর ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দলিল উদ্দিন। তিন আক্ষেপের সুরে বলেন,অবস্থা দৃষ্টি মনে হয় বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের কোন গরজ নেই কর্তৃপক্ষের! নেই কোন মাথা ব্যথা!
এদিকে নতুন করে গুরুতর অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ পাওয়া গেছে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো: রেজাউল হকের বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়ের সম্পত্তি নিজ নামে দোকান বরাদ্দের ঘটনায় তার নাম সামনে চলে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে,বিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তিতে অন্যান্য কথিত ভাড়াটিয়াদের মতো তিনি নিজেও একটি দোকান ঘর গড়ে তুলেছেন। তবে,গেল টানা দশবছর ধরে প্রভাব খাটিয়ে তিনি একটি টাকাও ভাড়া বাবদ স্কুল প্রতিষ্ঠানকে দেননি। বিষয়টি তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে অকপটে স্বীকারও করেছেন। তিনি অত্র বিদ্যালয়ে ২০০৫সালের ২২অক্টোবর সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন,আপন সহোদর ছোট ভাই নজরুল ইসলামের কাছ থেকে দোকানটি তিনি ৫০হাজার টাকায় কিনেছিলেন। ছোট ভাইয়ের কাছে তিনি মাসিক দেড় হাজার টাকায় ভাড়া দিয়েছেন বলে অকপটে স্বীকার করেছেন। অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন,২০২০সালের পহেলা নভেম্বর যোগদানের পর থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক মো: রেজাউল হক ঘরভাড়া বাবদ স্কুল প্রতিষ্ঠানকে অদ্যবধি একটি টাকাও দিয়েছেন কিনা তার জানা নেই। তবে তার একটি দোকান ঘর রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক মো: মুস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা ব্যাপক দুর্নীতি,অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার গুরুতর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন,বিগত ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে পূর্বের নিয়মের ভাড়া অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় (প্রতিহাত তিন টাকার স্থলে ১৫টাকা) নতুন নিয়মে ১৫টাকার প্রস্তাব করা হলেও বাবলু ডাক্তার,ইদ্রিস আলী,মোঃ হোসাইনসহ বেশিরভাগ ভাড়াটিয়া বিরোধিতা করে আসছেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়কে অবগত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বিদ্যালয়ের সম্পত্তিতে গড়ে ওঠা ২১৪টি দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাজ থেকে ভাড়া বাবদ আদায়কৃত টাকা বিদ্যালয়ের নিজনামীয় একাউন্টে (ব্যাংক হিসাব) জমা হয় কিনা? হয়ে থাকলে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ কত? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক মো: মুস্তাফিজুর রহমান দাবি করেন, লক্ষাধিক টাকা বিদ্যালয়ের নিজস্ব একাউন্টে জমা আছে। প্রধান শিক্ষকের এই দাবীকে হাস্যকর ও অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তিতে যেসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে বাজারমূল্য হিসেবে তা অযৌক্তিক অগ্রহণযোগ্য ও অতীনগণ্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে,গঙ্গানন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাড়ে ১৮বিঘা সম্পত্তির মধ্যে প্রায় ১২বিঘা সম্পত্তিতে অবৈধভাবে দোকানপাট-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠ। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বেআইনি দখলদার কথিত এসব ভাড়াটিয়াদের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। যার স্মারক নং ৪৬১ তাং ০৪/০৩/২০২৬ ইং।
এর প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে গত ৪মার্চ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গণশুনানি চলাকালে অত্র বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: মোস্তাফিজুর রহমান,সহকারি প্রধান শিক্ষক মো: রেজাউল হক,সহকারি শিক্ষক আবুল কাশেম, সহকারি শিক্ষক কামরুজ্জামান,সহকারি শিক্ষক শামীম হোসেন,সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, ল্যাব সহকারী আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ও কথিত ভাড়াটিয়াদের বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। তথ্য মিলেছে এসময় বেশ কয়েকজন কথিত ভাড়াটিয়া পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছিলেন।গণশুনানি চলাকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও প্রশাসক মোছা: রনী খাতুন প্রধান শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করে বলেন,বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়সহ যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ-সম্পত্তির হিসাব নিকাশ থেকে দায়মুক্তির কোন প্রকার সহজ সুযোগ নেই।
এমতাবস্থায় গণশুনানি চলাকালে পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মানবিক বিবেচনায় এক মাসের সময়ের আবেদন করেন প্রধান শিক্ষক। অতঃপর আবেদন মঞ্জুর করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে,ইতিপূর্বে অভিযোগ প্রমাণিত বেরিয়ে এসেছে ব্যাপক অনিয়ম,অব্যবস্থাপনা ও লাখ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন,কথিত মালিকানা ও পজিশন হস্তান্তরসহ চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।
চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির এতদসংক্রান্ত তথ্যবহুল সংবাদটি (০৩ মার্চ ও ০২ এপ্রিল) দৈনিক গ্রামের কাগজ পত্রিকায় ফলাও করে তুলে ধরা হয়। এর প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে অবৈধ দখলদার কথিত ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদের লিখিত আবেদন ও বিদ্যালয়ের যাবতীয় নথিপত্রসহ তাঁর কার্যালয়ে তলব করেন। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে অত্র বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক,সহকারী শিক্ষকসহ কতিপয় শিক্ষক, হাট মালিক ও ভাড়াটিয়াদের দুই একজন উপস্থিত ছিলেন। এদিন বেশিরভাগ ভাড়াটিয়া না আসায় ক্ষুব্ধমত প্রকাশ করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। আলোচনায় বিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণে বিধিবিধান ও নিয়ম নীতিমালার আলোকে সঠিক তদারকির ব্যাপারে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নেপথ্য উদাসীনতা,রহস্যজনক ভূমিকা,অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিস্তর অভিযোগ ও অসঙ্গতি প্রকাশ পায়। ফলে ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদসহ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারী বার্তা দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও প্রশাসক মোছা: রনি খাতুন।
উল্লেখ্য যে,বিদ্যালয়ের নিজস্ব এসব সম্পত্তির বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য শতকোটি টাকা।
সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে,গঙ্গানন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিজস্ব এই সম্পত্তিতে ২১৪টি পাকাস্থাপনা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। কোন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে এসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থাপনার বেশিরভাগ কংক্রিটের গ্রেডবিম ব্যবহার ও দীর্ঘস্থায়ী টেকসই ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পত্তিতে গার্মেন্ট,ফার্মেসি, বস্ত্রবিতান,হার্ডওয়ার,মুদিদোকান,হোটেল-রেস্তোরাঁ, রড,সিমেন্ট প্রভৃতি দোকানপাট গড়ে উঠেছে ।