* অপরিকল্পত নদী খননে খালে রূপান্তর * থামানো যাচ্ছে না দখল-দূষণ! * বেপরোয়া দখলবাজ ভূমিদস্যুরা * মানচিত্র হারিয়েছে শ্বেতগঙ্গা ও হরিহর ! * প্রতিবন্ধকতায় গতিপথ হারিয়েছে ভায়নার খাল

শতকোটি টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে কপোতাক্ষের ঐতিহ্যফেরাতে পুনখর্নন কর্মসূচির কার্যত সুফল মেলেনি। জোয়ার-ভাটা ফেরেনি মহাকবির প্রিয় নদ যশোর ঐতিহ্যের কপোতাক্ষে।বিস্তর অভিযোগ রয়েছে বিগত সরকারের আমলে কপোতাক্ষ জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়ে) বরাদ্দের ১২০কোটি টাকার প্রকল্পের টাকা নয়ছয় হয়েছে। হরিলুট হয়েছে প্রকল্পের মোটা অংকের টাকা। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যশোরের কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের গ্রুপ ভিত্তিক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে সাবলীজ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে।
প্রকল্প ঘিরে অভিযোগ ওঠে, ভাগবাটোরার অলিখিত কমিশন পেয়ে তুষ্ট থেকেছে সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটি। প্রকল্পের মোটা টাকার নয়ছয়তো হয়েছেই। সেই সাথে নদী খনন করে সরুখালে রূপান্তরিত হয়েছে কপোতাক্ষ! নদের দুপাড়ের বিপুল পরিমাণ খাসজমি ফেলে রাখায় পর্যায়ক্রমে তা ফের অপদখলে চলে যাচ্ছে।নদ অববাহিকার মাইলের পর মাইল নদের জমিদখল করে মৎস্যঘের-পুকুর জলাশয়ের পাশাপাশি পাকাভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। পত্রপত্রিকায় ব্যাপক লেখালেখি হয়েছে।কোন কাজে আসেনি। প্রকল্প ঘিরে পাউবোর বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল ওঠে। রহস্যজনক কারণে তাদের টনক নড়েনি। কোন অভিযোগ আমলে নেইনি এমন বিস্তর অভিযোগ ওঠে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একটি বিশ্বস্ত সূত্রমতে,১২০কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৭কি:মি: দৈর্ঘ্য নদের ৬০ফুট প্রস্থ,গড় গভীরতা ১০ফুট ও উভয় পার্শ্বে ২০ফুট পাড় রেখে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের নামে কপোতাক্ষ খনন করা হয়।অথচ নদের কোন কোন এলাকার প্রস্থ ৩/৪'শ ফুট বা তারচে বেশি হতে পারে।ফলে নদের এই তীরবর্তী খাসজমি অরক্ষিত থেকে যায়।ফলস্রুতিতে একশ্রেণির মানুষ নদের খাসজমি দখলে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে।
এদিকে মানচিত্র হারাতে বসেছে 'শ্বেতগঙ্গা ও হরিহর নদী'। ঝিকরগাছা উপজেলার নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা-অচেনা ও অবিশ্বাস্য এক নদীর নাম 'শ্বেতগঙ্গা'। প্রবীনদের অনেকেই জানেন না যে,একদা ঝিকরগাছায় শ্বেতগঙ্গা নামে একটি নদীর অস্তিত্ব ছিল। নৌকা চলাচল করতো। জোয়ার-ভাটা বইতো। এখন তা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। সাইনবোর্ড ও মানচিত্র সর্বস্ব! এই নদীটির অবস্থান উপজেলার গদখালি ইউনিয়নের টাউরা গ্রামে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে,গেল বর্ষামৌসুমে গদখালী পানিসারা ইউনিয়নে জলাবদ্ধতার উৎসমুখ খুঁজতে গিয়ে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও প্রশাসক ভুপালি সরকারের নজরে আসে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের(পাউবো) একটি সাইনবোর্ড। ঘন জনবসতিপূর্ণ লোকালয়ের ভেতর শ্বেতগঙ্গা নদীর নামে সাইনবোর্ড দেখে তিনি কিছুটা হতবাক ও বিস্মিত হন। তাঁর সফর সঙ্গী উপজেলা
কৃষি অফিসার,উপজেলা প্রকৌশলীসহ কয়েকজন কর্মকর্তা সাইনবোর্ড এর পাশে দাঁড়িয়ে ছবিও তোলেন। উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীরা প্রশ্ন তুললেও তিনি বিস্মিত হওয়া ছাড়া কোন মন্তব্য করেননি। এখানে পানি প্রবাহে সরু একটি নালার অস্তিত্ব দৃশ্যমান থাকলেও কোন নদীর অস্তিত্ব নেই! আছে অসংখ্য পুকুর-জলাশয়।কালক্রমে সব দখল হয়ে গেছে।
জনশ্রুতি অনুযায়ী স্থানীয়দের মতে,গদখালি বাজারের ঐতিহাসিক কালী মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আজও দৃশ্যমান খালই হলো এককালের স্রোতধারায় বয়ে চলা শ্বেতগঙ্গা নদী।যেটি গদখালি ইউনিয়নের টাওরা,সৈয়দপাড়া,নীলকন্ঠ নগর,পানিসারা ও মোহিনী কাটির ভেতর দিয়ে কপোতাক্ষে সংযোগ ছিল। মানচিত্র খেকো দখলবাজ ভূমিদস্যুদের কালোথাবার অপদখলে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে ভায়নার খাল। যেটি সরাসরি ঐতিহাসিক উলাশি খালের সাথে সংযুক্ত।
ভারত সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ অংশের বেলতা কাশিপুর হয়ে উপজেলার গঙ্গানন্দপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমি বিল বোনমান্দার সংলগ্ন বিষহরি,কাগমারি,রাঁধানগর,শ্যামনগর,কানাই নগরের ভেতর দিয়ে শিমুলিয়া ইউনিয়নের খাসখালি মহাশ্মশান, শ্রীরামকাঠি ও শেয়ালঘোনার ভেতর দিয়ে নাভারন অংশে উলাসী খালের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। অপরদিকে ঐতিহাসিক হরিহর নদীর অস্তিত্ব ঝিকরগাছা অংশে বিলীন প্রায়। যশোর সদর উপজেলার গোয়ালদাহ বাজার পর্যন্ত হরিহর নদীর অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান। তবে পানি শূন্য। এ যেন মরা খাল! কালক্রমে দখল হতে হতে হরিহর নদীর অস্তিত্ব আজ বিলিনপ্রায়।
উপজেলার মির্জাপুর,দোস্তপুর,কাশিপুর ও মল্লিকপুরের ভেতর দিয়ে এসে পৌরসদর কীর্তিপুর জমির শাহ দরগার পাশ দিয়ে কাটাখাল অতঃপর কপোতাক্ষে পতিত হয়েছে হরিহর। এসব কেবলই অতীত ইতিহাস-মানচিত্রের এক করুন সাক্ষ্য! অন্যদিকে ভরা বর্ষামৌসুমে বিস্তীর্ণ ফসলি জলাভূমির পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহ যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত মুক্তেশ্বরী নদী পুলেরহাট হয়ে দেয়াড়া ইউনিয়নের বুকভরা বাওড় হয়ে ঝিকরগাছার কাটাখাল অতঃপর কপোতাক্ষে মিলিত হওয়ায় হাজার হাজার একর ফসলি জমির আবাদ জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে বহুকাল ধরে।অথচ দখল-দূষণ আর নানা প্রতিবন্ধকতায় আটকে গেছে বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানির প্রবাহ। ফলে জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির শিকার হন এতদাঞ্চলের হাজারো কৃষক ও কৃষিজীবী পরিবার।ঝিকরগাছার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ বিল কচুয়ার বুকে এখন শত শত মৎস্যঘের। কিয়দাংশ সবুজ ফসলের মাঠ। প্রতিবর্ষা মৌসুমে অভিশপ্ত জলাবদ্ধতায় ফসলহানি হয়ে সর্বশান্ত কৃষকেরা তাই বিকল্প লাভজনক কৃষি অর্থনীতি মাছের ঘের করতে বাধ্য হন।কিন্তু,অল্প জমি কিংবা আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় বেশিরভাগ কৃষক এখনো রোপাআমন চাষের উপর নির্ভরশীল। ফলে ফসলি জমিতে জলাবদ্ধতার শঙ্কা তাদের পিছু ছাড়ে না। ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি ফসলি জমির জলাবদ্ধতার দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই একমাত্র সমাধান হতে পারে অবৈধ দখল ও স্থাপনা উচ্ছেদসহ কপোতাক্ষ সংযোগ খালসমূহ পুনখর্নন।
স্বনির্ভর কৃষি অর্থনীতির স্বপ্নদ্রষ্টা সাবেক সফল রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কৃষককে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালের পহেলা নভেম্বর তারিখে (তৎকালীন মেজর জেনারেল) শার্শার যদুনাথপুরে উলাসী খালখনন যুগান্তকারী কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন। এরপর প্রকল্পটি '৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চালু ছিল। ঐতিহাসিক এই খাল খননের ফলে বৃহত্তর কৃষি জনপদের কৃষকেরা যে সুফল পেয়েছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। বলা বাহুল্য খালের দু'ধারে মাইলের পর মাইল রোপন করা হয় লাখ লাখ দেশি বাবলার চারা। যা প্রকৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সবুজ বেষ্টনীর এই বাবলার চারা অপরূপ নান্দনিক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকের সেচসুবিধায় ফসলের উৎপাদন বাড়ে দ্বিগুন।সামগ্রিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে স্বনির্ভর কৃষিতে। বর্তমান সরকার দেশব্যাপি খালখনন কর্মসূচির প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৭এপ্রিল ঐতিহাসিক উলাসীখাল পুনখর্ননের উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে। উলাসীর খালসহ কপোতাক্ষ সংযোগ খাল সমূহ পুনখর্ননের উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়িত হলে কৃষিখাতে এতদঞালে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন কৃষকেরা।কেননা খালখনন শুধুমাত্র বর্ষামৌসুমে জলবদ্ধতা নিরসনের শঙ্কা দূর করে তা নয়। বরং শুষ্ক মৌসুমে কৃষকের ফসলি জমির সেচসুবিধা নিশ্চিত করতে পারে আটকে থাকা প্রয়োজনীয় খালের পানি। নিশ্চিত হতে পারে কৃষকের কৃষি নির্ভর অর্থনীতি।কৃষিনির্ভর অর্থনীতির চাকা সচল থাকলে দেশ স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যায় তা বলাই বাহুল্য।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শার্শার উলাশীর খালপুনর্খনন কর্মসূচির উদ্বোধন ঘিরে এই জনপদে কৃষকের মাঝে আবারো আসার সঞ্চার করেছে। প্রকৃতি জীব ও বৈচিত্রের সুরক্ষার পাশাপাশি কৃষিতে দ্বিগুণ-বহুগুণ সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন এই জনপদের কৃষকেরা।